এরই মধ্যে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। যার বেশির ভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায়।
উদ্যোক্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল (সোলার প্যানেল) স্থাপনে উৎপাদন খরচ প্রায় অর্ধেক। বর্তমানে শিল্পে গ্রিডের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ১২ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে।
সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ১৬ টাকার কাছাকাছি ওঠে দাম।
এর বিপরীতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ হচ্ছে ৪ থেকে ৮ টাকা।
ফলে বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছেন শিল্প মালিকরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পাঁচ বছর আগে ছাদে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে খরচ হতো প্রায় ৫ কোটি টাকা। এখন তা কমে প্রায় ৪ কোটি টাকায় নেমেছে। আর জমিতে একই ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে খরচ পড়ে প্রায় ৮ কোটি টাকা। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতির দাম কমে আসায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়ছে।
ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এরই মধ্যে তাদের কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সাতটি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।
নতুন করে সিরামিক, তৈরি পোশাকসহ ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। বাকি ৮ মেগাওয়াট আগামী বছর উৎপাদনে আসবে।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপের কারণে তারা দ্রুত সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছেন। নতুন প্রযুক্তির কারণে এখন আগের তুলনায় কম সময়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যাচ্ছে। আমাদের কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ হচ্ছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।
ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্প-কারখানাগুলোতে গত এক দশকে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুরু হলেও গত তিন বছরে এ বিনিয়োগ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে এ বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন শিল্প মালিকরা।
যেসব প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, শিল্প-কারখানার ছাদে বসানো বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই গত দুই বছরে স্থাপন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে বর্তমানে ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। তবে সংস্থাটির হিসাবে, ২৩৯টি বড় শিল্প-কারখানার ছাদে স্থাপন করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। যার সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াট। ছোট স্থাপনার ছাদও হিসাবের আওতায় এলে দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট উৎপাদন ক্ষমতা হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।
নিজেদের কারখানাগুলোতে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কারখানার ছাদে ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ২০টি কারখানায় ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চলতি বছর আরও অন্তত ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুটি কারখানা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
আকিজ বশির গ্রুপের জনতা জুট মিলে স্থাপন করা হয়েছে ২১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। এতে মিলটির বিদ্যুতের চাহিদার শতভাগ পূরণ হচ্ছে। হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের কারখানার ছাদে স্থাপন করা হয়েছে ১৩ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট। এর মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সিস্টেম রয়েছে। ফলে কারখানাটি রাতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারছে। সব মিলিয়ে আকিজ বশির গ্রুপ বর্তমানে ছাদ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। আরও ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) বিভিন্ন কারখানার ছাদে স্থাপন করা হয়েছে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট। এতে তাদের কারখানাগুলোর মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। নতুন করে আরও ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে।
এ বিষয়ে এমজিআইয়ের পরিচালক তানভীর মোস্তফা জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কারখানার ছাদ ছাড়াও ভবনের সামনে, সীমানাপ্রাচীর ও সড়ক বিভাজকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উপায় খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যান চালু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে এলপিজি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০০টি শিল্প-কারখানার ছাদে ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। বর্তমানে আরও ১২টি শিল্প-কারখানায় কাজ চলছে। এসব প্রকল্প চালু হলে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওমেরা সোলারের সিইও মাসুদুর রহমান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। একটি সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট ২০ থেকে ২৫ বছর চলে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বড় খরচ নেই। গ্রিডের তুলনায় উৎপাদন খরচ অর্ধেক বা তারও কম। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও কমে আসে। রাইজিং গ্রুপের ছয়টি কারখানায় ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে দুটি পোশাক কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাদ ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে। ফলে আগ্রহ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের।
তবে শিল্পকারখানার বিদ্যুতের পুরো চাহিদা ছাদ ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সাধারণত মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হয়। কোনো কোনো কারখানায় এ হার আরও বেশি। দিনে কয়েক ঘণ্টা কারখানার কার্যক্রম চালাতেও সহায়তা করছে সৌরবিদ্যুৎ। এতে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমছে।
শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা থাকলেও অর্থায়ন এখনো বড় বাধা। বিজিএমইএর ৪২৪টি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে মালিকেরা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা। বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপের কারণেও তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৫ শতাংশ এবং ইডকল থেকে ৬ শতাংশ সুদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ইডকলের ঋণের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সুদের হার আরও কমানো অথবা ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো হলে মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলোও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে।
সিপিডির এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের তিন হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। আরও ১ হাজার ৩০০ কারখানায় দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।
অর্থায়ন সহজ করা গেলে শিল্প-কারখানার ছাদ ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ খরচ কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৫ শতাংশ এবং ইডকল থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ মিললেও ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। সুদ কমালে বা ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়ে ৯ বছর করলে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করতে পারবেন মাঝারি শিল্প-কারখানার মালিকরাও।