দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে শুরু থেকেই উদ্বেগ ছিল। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা ছিল, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপুল কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও জনবসতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
এই আশঙ্কা থেকেই স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। পরে জাতীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি আন্দোলনে যুক্ত হলে তা বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নেয়।
যে দিনে বদলে যায় ফুলবাড়ীর ইতিহাস
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে বড় একটি সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীরা এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়।
একপর্যায়ে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক আন্দোলনকারী।
রক্তাক্ত ওই ঘটনার পর ফুলবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ছয় দফা চুক্তি, কিন্তু শেষ হয়নি অপেক্ষা
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ছয় দফা দাবিতে সমঝোতা হয়। চুক্তিতে এশিয়া এনার্জির কার্যক্রম বন্ধ ও প্রত্যাহার, দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা, নিহত ও আহতদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু দুই দশক পরও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ছয় দফার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মামলা প্রত্যাহার, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ স্বীকৃতি ও অন্যান্য দাবির বাস্তবায়ন নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ রয়েছে।
উন্নয়ন বনাম মানুষের জীবন-জীবিকা
ফুলবাড়ীর আন্দোলন শুধু কয়লা খনির বিরোধিতা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর কেন্দ্রে ছিল—উন্নয়নের নামে কৃষিজমি, পানি, পরিবেশ ও মানুষের বসতি কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে, সেই প্রশ্ন।
ফুলবাড়ীর উর্বর কৃষিজমি বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান ভিত্তি। ফলে স্থানীয়দের কাছে খনি প্রকল্পের প্রশ্নটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
বাংলাদেশের কয়লা ও জ্বালানি নীতি নিয়েও ফুলবাড়ীর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির অভিজ্ঞতার আলোকে খনি কার্যক্রমের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
২০ বছর পরও স্মৃতিতে ২৬ আগস্ট
ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ২০ বছর পূর্ণ হলো আজ। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে; কিন্তু ২৬ আগস্টের স্মৃতি মুছে যায়নি।
তিন তরুণের মৃত্যু, শত শত মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী ছয় দফা সমঝোতা ফুলবাড়ীর ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুই দশক আগে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
ফুলবাড়ীর মানুষ ও আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের কাছে ২৬ আগস্ট তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়। এটি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় মানুষের জীবন, কৃষি, পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদের স্বার্থকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে—সেই প্রশ্ন সামনে আনারও দিন।