প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কুসরার বাড়িগুলোতে অবরোধ চালাচ্ছে বসতি স্থাপনকারীরা। এতে ফিলিস্তিনিরা এমন একটি এলাকায় আটকা পড়েছেন, যেখানে বসতি স্থাপনকারীরা আরও বেশি জমি দখলের সমন্বিত চেষ্টা চালাচ্ছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যতে যেখানে রাষ্ট্র গঠনের কথা ভাবছেন, সেই ভূখণ্ড আরও সংকুচিত হচ্ছে।
এই অবরোধ প্রকাশ্যে মার্কিন সমালোচনার মুখে পড়েছে। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতির কট্টর সমর্থক এবং ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি গত ১৩ আগস্ট ফিলিস্তিনি একটি বাড়ি অবরোধ করে রাখা বসতি স্থাপনকারীদের ‘ইসরাইলি সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেছেন।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা গত ১৪ আগস্ট জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু যাতে প্রকাশ্যে এই অবরোধের নিন্দা জানান, তার জন্য হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা চাপ প্রয়োগ করছেন। অবরোধের কবলে থাকা বাড়িগুলোর একটি একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকানের বলে জানার পর ওয়াশিংটন প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তারা। স্পর্শকাতর এই আলোচনার কথা তুলে ধরতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই দুই কর্মকর্তার বক্তব্যই এই তথ্যের ভিত্তি। কুসরার অবরোধ নিয়ে নেতানিয়াহু এখনো কোনো মন্তব্য করেননি। তার কার্যালয় বা হোয়াইট হাউসও মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
‘বসতি স্থাপনকারীরা এখনো এখানেই আছে’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরাইলের ওপর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গত তিন বছরে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। প্রায় দুই মাসের মধ্যে নির্বাচনের আগে বসতি স্থাপনকারীদের নিন্দা জানানো নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, তার ডানপন্থি জোটের একটি অংশ বসতি স্থাপনকারী ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল। জনমত জরিপ বলছে, ২০২৩ সালের হামাসের হামলায় ধাক্কা খাওয়া নিরাপত্তা ভাবমূর্তির কারণে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারাতে পারেন।
গ্রামের অবরুদ্ধ তিনটি বাড়ির একটিতে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি নারী আইশা হাসান ফোনে রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা খুব ভয়ে আছি। নতুন কিছুই নেই। ছয় দিন ধরে এভাবেই চলছে। বসতি স্থাপনকারীরা এখনো এখানেই আছে।’ আইশা জানান, তিনি ভোরের দিকে বাড়ির নিচে বসতি স্থাপনকারীদের দেখতে পেয়েছেন। তিনি রয়টার্সের কাছে জানালা থেকে তোলা কিছু ভিডিও শেয়ার করেছেন। এতে বসতি স্থাপনকারীদের একটি দলকে তার বাড়ির নিচে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, দুই শিশুসহ প্রায় ১৫ জন ফিলিস্তিনি বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াই তাদের বাড়িতে আটকা রয়েছেন। রয়টার্সের পাওয়া অন্য একটি অবরুদ্ধ বাড়িতে আটকা ফিলিস্তিনি বাসিন্দার তোলা ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি নীল তাঁবুর কাছে সাতজন বসতি স্থাপনকারী দাঁড়িয়ে আছেন। এদের একজনকে কাছের গ্রামের দিকে পাথর ছুড়তে দেখা গেছে, আরেকজন চেয়ার নিয়ে এসেছেন। এরপর ইসরাইলি সেনাদের গাড়ি ও সেনারা সেখানে পৌঁছালে তাঁবুটি মাটিতে ফেলে দেয়া অবস্থায় দেখা যায়।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘কুসরা এলাকায় ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিকরা একটি তাঁবু গেড়েছিল। আইডিএফ সেনারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সুরক্ষা দিয়ে এটি সরানোর কাজ করেছে।’ এর একদিন আগে ডজন ডজন সেনা কুসরায় পাঠানো হয় এবং তারা গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়ি দখলে নেয়।
ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি এই সরকার ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে ইসরাইল ডজন ডজন নতুন বসতি ও বসতি স্থাপনকারী চৌকি প্রতিষ্ঠা করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বসতি স্থাপনকারীরা কুসরা ও পার্শ্ববর্তী জালুদের বাইরের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি এই দুই এলাকার মাঝের ভূখণ্ড দখল করে দক্ষিণে বসতি স্থাপনকারীদের চৌকি এবং পশ্চিমে বৃহত্তর বসতিগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করার কৌশলেরই অংশ।
বসতি স্থাপনকারীরা যখন তিনটি বাড়ির সামনের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে তাঁবু গেড়ে বসে এবং কাউকে ঢুকতে বা বের হতে না দেয়ার হুমকি দেয়, তখনই এই সপ্তাহান্তে অবরোধ শুরু হয়। এর আগেই তারা বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ কেটে দিয়েছিল।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বাসিন্দাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে ১৩ আগস্ট সকাল থেকে কুসরায় সেনারা মোতায়েন রয়েছে। এই সপ্তাহের শুরুতে ধারণ করা ভিডিওতে সবুজ সামরিক পোশাকে থাকা বেশ কয়েকজন ইসরাইলি ব্যক্তিকে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে তাঁবুতে ভোরের নামাজ পড়তে দেখা গেছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এতে জড়িত যে কারো বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
ইসরাইলি বসতি পর্যবেক্ষক সংস্থা পিস নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ৫ লাখ বসতি স্থাপনকারী বাস করেন। এই অঞ্চলে ১৪৬টি বসতি এবং ৩৯০টি ছোট বসতি স্থাপনকারী চৌকি রয়েছে।