সোনাগাজীতে প্রাথমিক স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান “স্বদেশ পল্লী” অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোনাগাজী উপজেলার পৌরসভাসহ নয়টি ইউনিয়নের ১১০টি বিদ্যালয়ের ১২৯৫৮ জন শিক্ষার্থীর মাঝে তারা খাবার সরবরাহ করে আসছেন। চলতি বছর ২৯ মার্চ থেকে তারা খাদ্য সরবরাহ করছেন।
সোনাগাজী উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ভাড়াঘর “ওয়্যার হাউজ” থেকে ১ জন জেলা কো-অর্ডিনেটর, ১ জন উপজেলা কো-অর্ডিনেটর, ১ জন অফিস কর্মকর্তা, ১ জন অডিট কর্মকর্তা ও ৮ জন ডেলিভারি স্টাফ এর সহায়তায় ৮ টি পিকআপ যোগে সকাল ১১ টার পূর্বেই বিদ্যালয় গুলোতে খাবার পৌঁছে দেয়া হয়ে থাকে।
খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান “স্বদেশ পল্লী”এর সোনাগাজী উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ বলেন, প্রকল্পের প্রথম মাসে বিদ্যালয় গুলোতে আমরা ১২৮৫১ জন শিক্ষার্থীর জন্য খাবার সরবরাহ করেছিলাম। এখন ছাত্র সংখ্যার উপস্থিতির হার বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আমরা ১২৯৫৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য খাবার সরবরাহ করছি। খাবারের গুনগত মান বজায় রেখে প্রস্তুত এবং প্যাকেটজাত করে আমরা দুর্গম এলাকায়ও যথা সময়ে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসছি।
দক্ষিণ পূর্ব চর চান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিক উল্লাহ জানান, তিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন, তখন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫৭ জন। গড়ে উপস্থিত থাকতো ৩৫ থেকে ৪০ জন। বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০৭ জন। স্কুল ফিডিং চালু করায় গড়ে ৮৫ থেকে ৯০ জন ছাত্র-ছাত্রী প্রতিদিন উপস্থিত থাকেন।
তিনি আরো জানান, এ বিদ্যালয়টি সোনাগাজীর নদীভাঙ্গন এলাকায়। এক সময় পুরো স্কুলটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পাশাপাশি পুরো গ্রামের শত শত বাড়ী-ঘরও নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে উক্ত এলাকায় নতুনভাবে বসতি গড়ে উঠেছে। নতুন করে বিদ্যালয়ের ভবনও নির্মিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের আশপাশ অতি দরিদ্রপিড়ীত এলাকা। লোকজনের জীবনযাত্রার মানও দরিদ্র সীমার নিচে। এমতাবস্থায় গরিব ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের এই কর্মসূচি অত্যন্ত ফলপ্রসু ও সন্তোষজনক। স্কুল ফিডিং কার্যক্রম সম্পর্কে সোনাগাজী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সোনাগাজী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসাইন আহমদ জানান, স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর আওতায় যে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে তা একজন শিশুর ক্ষুধার চাহিদা পূরণের সাথে সাথে পুষ্টির অভাব দূর করে সুস্থ ও সবল নাগরিক গড়ার লক্ষ্যে এ খাবার অত্যন্ত উপযোগী। ফিডিং কর্মসূচী চালু হওয়ায় বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তি এবং উপস্থিতির হার বাড়ছে, বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ যেমনি বাড়ছে তেমনি স্কুল ফাঁকি দেয়ার প্রবণতাও কমছে। তাছাড়া শিশুদের খাবার নিয়ে অভিভাবকদের অতিরিক্ত চিন্তা করার প্রয়োজন হচ্ছে না। এ দিকে বিদ্যালয়ে এ কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ বেড়ে গেছে। এমতাবস্থায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে পিয়ন কাম নৈশ প্রহরী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরসহ দক্ষ জনবল বাড়ানো গেলে শিক্ষকগণ নিরবিচ্ছিন্ন পাঠদান চালিয়ে যেতে পারবে। ফলে মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে ।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন জমিয়াতুল মোদাররেসিন এর সোনাগাজী উপজেলা সভাপতি ও বক্তারমুন্সী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নুরুল আবছার ফারুকী বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারের স্কুল ফিডিং কার্যক্রম এটা বর্তমান সরকারের একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং বিদ্যালয়ে ছাত্র উপস্থিতি বাড়াতেই মূলতঃ এ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের আওতায় মাদ্রাসার ইবতেদায়ী স্তরের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত না রাখা সত্যিই দুঃখজনক এবং বৈষম্যমূলকও বটে।
তিনি আরো বলেন, বরাবরই অতীত থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবহেলিত এবং উপেক্ষীত। ইতিমধ্যে জমিয়াতুল মোদাররেসিনের নেতৃবৃন্দ মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যতা দূরীকরণের বিষয়টিও মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এস.এম. তাহেরুল ইসলাম জানান, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হওয়ার পর সোনাগাজী উপজেলায় বিশেষ করে উপকূলীয় ইউনিয়নের স্কুল গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। এ কার্যক্রমের কারণে স্কুল গুলোতে এখন ৯০% শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে উপকূলীয় এবং সুবিধাবঞ্চিত এলাকা হিসেবে সোনাগাজী উপজেলাকে সরকারের পক্ষ হতে প্রথমে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা এটা সত্যিই সোনাগাজীবাসীর জন্য আনন্দের। কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রতিটি শিশুর মাঝেই অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। যথাযথ শিক্ষা ও পুষ্টির সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সব সম্ভাবনার বিকাশ ঘটনো সম্ভব। অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, শুধু খাবার বিতরণ নয় প্রান্তিক এলাকায় শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত তাদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা গেলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচীর সুফল আরো বিস্তৃতভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। পুষ্টিকর খাবার শুধু শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশই নয়, তাদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, মনোযোগ ও পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক। তাই এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সোনাগাজীর সুবিধা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও পুষ্টির উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।