প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এডিপির আওতায় হরিপুর উপজেলায় মোট ১৮টি পিআইসি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি প্রকল্পের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাসুদ রানা। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পগুলোর অধিকাংশ কাজ শুরু হওয়ার আগেই সভাপতিদের নামে ইস্যুকৃত চেকের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। ফলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় একাধিক প্রকল্প সভাপতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রকল্পের কাজ, বরাদ্দ কিংবা বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানেন না। এমনকি এলজিইডির মাধ্যমে কোন প্রকল্পে কী কাজ হবে, সে বিষয়েও তাদের কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন তারা।
ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও তিনটি প্রকল্পের সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, আমাকে শুধু বলা হয়েছে আমি সভাপতি। প্রকল্পের টাকা মাসুদ রানার কাছেই আছে। আমি জানতে চাইলে বলা হয়েছে গাছ লাগানো হবে, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হবে। এর বাইরে কিছু জানি না। সাংবাদিকরা জানতে চাইলে এতটুকুই বলতে বলেছেন।
আমগাঁও ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও একটি প্রকল্পের সভাপতি আব্দুল করিম বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মাসুদ ভাইকে দিয়েছি। কাজগুলো পরে করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
একাধিক প্রকল্প সভাপতির অভিযোগ, তাদের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করা হলেও প্রকল্পের প্রকৃত কাজ, বরাদ্দের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে, অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. আব্দুস সালাম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি লেখেন, হরিপুর উপজেলার প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি পোস্ট তার নজরে এসেছে এবং বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন।
তিনি আরও লেখেন, সংবাদকর্মীদের ধন্যবাদ, যারা বিষয়টি নজরে এনেছেন। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, আমার নাম ভাঙিয়ে অথবা আমার নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অনিয়ম করে, তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছি। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অপরাধীর পরিচয় যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঠাকুরগাঁও-২ আসনের মানুষ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা আমি সততার সঙ্গে পালন করে যাব।
অন্যদিকে, গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসানও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসংবলিত একটি পোস্ট শেয়ার করে তিনি লেখেন, প্রিয় ঠাকুরগাঁও-২ আসনের জনগণ টের পাওয়া শুরু করেছেন, সামনে আরও পাবেন। কথা দিয়ে কথা রাখেননি, ফলাফল নিজের চোখেই দেখতে থাকুন। ধন্যবাদ। আমি ফারুক হাসান আছি আপনাদের পাশে এবং থাকব ইনশাআল্লাহ।
হরিপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দীন বলেন, হরিপুরে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে হরিলুট চলছে। এখানে মামা-ভাগিনা সিন্ডিকেট কাজ করছে। উপজেলা প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিব এসব অনিয়মের মূল হোতা। তাদের যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দের লাখ লাখ টাকা লুটপাট করা হচ্ছে। এমপির নাম ভাঙিয়ে এসব করছে মাসুদ রানা। এতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিষয়টি আমরা দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের জানিয়েছি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চন্দন কর বলেন, অনিয়মের বিষয়টি শুনেছি। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব। প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে বুঝে নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।