প্রায় সাত বছর আগে ছোট একটি মুদি দোকান দিয়ে সংসার শুরু করেছিলেন গণি। কিন্তু ঋণের চাপে একসময় সেই দোকানও হারাতে হয়। শেষমেশ বাধ্য হয়ে গত বছর গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সংসারের খরচ সামলাতে না পেরে স্ত্রীকেও নামতে হয়েছে একই পেশায়।
স্বামী-স্ত্রী মিলে মাসে আয় সর্বোচ্চ ২৭ হাজার টাকা। শুনতে যতটা মনে হয়, বাস্তবে তা টিকিয়ে রাখা কঠিন। নয় হাজার টাকা বাসা ভাড়া, পাঁচ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি, দুই সন্তানের পড়াশোনায় আরও প্রায় পাঁচ হাজার—সব মিলিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায় আয়ের হিসাব। বাকি টাকায় খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত—সবই চালাতে হয়। অনেক সময় ধার না করে উপায় থাকে না।
গণি বলেন, “মাসের শেষে প্রায়ই ধার করতে হয়। স্ত্রী অসুস্থ থাকলে আয় আরও কমে যায়। তখন কীভাবে চলব বুঝে উঠতে পারি না।”
এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি দেশের হাজারো পোশাক শ্রমিক পরিবারের বাস্তব চিত্র।
২০২৩ সালে নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শ্রমিক নেতাদের মতে, একজনের আয়ে যেখানে চার সদস্যের পরিবার চলার কথা, সেখানে বাংলাদেশে দুজনের আয়ে একটি পরিবার টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরে জীবনযাত্রার খরচ দ্রুত বাড়ছে। একটি চার সদস্যের পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয় ২৮ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে—যা অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের আয়ের চেয়ে বেশি।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, “বর্তমান মজুরি কাঠামো দিয়ে শ্রমিকদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। আমরা আগেই বলেছিলাম এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এখন সময় এসেছে নতুন করে বাস্তবতার আলোকে বেতন নির্ধারণ করার।”
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন একসঙ্গে বসে নতুন মজুরি কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি করছে, যা শিগগিরই সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। অনেক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম আয় করেন, আবার বহু শ্রমিকের চাকরির কোনো লিখিত চুক্তিও নেই। ফলে তারা সবসময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন এই শ্রমিকরাই। কারণ তাদের চাকরির নিরাপত্তা নেই, নেই সামাজিক সুরক্ষা।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে গণির, আবার শুরু হয় নতুন লড়াই। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করেন তিনি।
এই শহরের উজ্জ্বল আলোয় ঢাকা পড়ে থাকা এমন গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অর্থনীতির বড় হিসাবের আড়ালে কতটা কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ।