সর্বশেষ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) পটিয়া উপজেলার ইন্দ্রপুল বাইপাস এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ২০ থেকে ৩০ জন নেতাকর্মী নিয়ে ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। ঘটনাস্থলটি পটিয়া থানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। মিছিল শেষে দ্রুত এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে ভিডিও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এর আগে নগরীর পাঁচলাইশ থানার অধীনে আরকান সড়কের বাদুরতলা এলাকায় ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখা ছাত্রলীগের উদ্যোগে আরেকটি ঝটিকা মিছিল হয়। প্রায় এক মিনিটের ওই মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ আশেপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করে। এছাড়া নগরীর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সামনে দামপাড়া এলাকায়ও মিছিল হয়েছে।
এর আগে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় এবং সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট লিংক রোড এলাকায় ছাত্রলীগের মিছিলের চেষ্টা করা হলে পুলিশি অভিযানে দুই স্থান থেকে ৬জন করে মোট ১২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারও করা হয়। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে গত একমাসে অন্তত অর্ধশতাধিক মিছিল করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসব মিছিলের পর সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে নগরী ও জেলার একাধিক এলাকায় এমন ঘটনা ঘটায় বিষয়গুলোকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কোথায় মিছিল হচ্ছে, কারা অংশ নিচ্ছে, অংশগ্রহণকারীরা কোন এলাকার বাসিন্দা এবং বিভিন্ন মিছিলে একই ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে কি না— এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মিছিলের পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে কারা সংগঠক হিসেবে কাজ করছে, অংশগ্রহণকারীরা কোথা থেকে আসছে, কোথায় জড়ো হচ্ছে এবং মিছিলের ভিডিও কারা ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে— এসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মিছিলের ঘটনাস্থল সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মিছিলের আগে থানার কাছে কোনো তথ্য ছিল কি না, থাকলে তা যথাযথ পর্যায়ে জানানো হয়েছিল কি না, ওই এলাকায় পুলিশের টহল বা নজরদারি কী অবস্থায় ছিল এবং মিছিলের পরপরই জড়িতদের শনাক্তে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে— এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা ছাত্রলীগকে তথ্য দিচ্ছেন বা কোনো ধরনের সহযোগিতা করছেন এসব বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও ফোনালাপ ভাইরাল হয়। সেখানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, পুলিশের বর্তমান সক্ষমতা এবং বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে উসকানিমূলক ও বিতর্কিত মন্তব্য করতে শোনা যায়। পরদিন (১৭ সেপ্টেম্বর) তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপির সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ডিএমপি একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
কমিটির প্রতিবেদনে অডিও বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর, ২৪ সেপ্টেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ক্যান্টনমেন্ট থানায় পেনাল কোডের ১২৪-এ (রাষ্ট্রদ্রোহ) এবং ১৫৩ ধারায় মামলা দায়ের করে। এর পরপরই রাজধানীর রাজারবাগ তাকে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে হাজির করে পুলিশ তার ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এ ঘটনার পর পুলিশ সদস্যদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্ভাব্য তথ্য বিনিময়ের বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঝটিকা মিছিলের কৌশল হচ্ছে অল্পসংখ্যক লোক দ্রুত একত্র হওয়া, কয়েক মিনিটের মধ্যে কর্মসূচি শেষ করা এবং পরে বিভিন্ন দিকে সরে যাওয়া। ফলে ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে আটক করা কঠিন। কিন্তু একই ধরনের কর্মসূচি একাধিক এলাকায় পুনরাবৃত্তি হলে এর পেছনে সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেটিও পুলিশের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মিছিলে শুধু অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না। এর পরিকল্পনা, স্থানীয় সংগঠক, অংশগ্রহণকারীদের যোগাযোগ, ভিডিও প্রচারের নেটওয়ার্ক এবং আগাম তথ্য ও নজরদারি সবকিছুই বিশ্লেষণ করতে হবে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, কোনো এলাকায় মিছিলের প্রস্তুতি সম্পর্কে আগে থেকে তথ্য থাকার পরও তা ঠেকানো না গেলে বিষয়টি আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে। আর যদি আগাম কোনো তথ্যই না থাকে, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের দুর্বলতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. আমিনুর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকার দলটিকে অবৈধ ঘোষণা করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। তাদের কোনো কার্যক্রমই হতে দেওয়া হবে না। মাঝেমধ্যে ফাঁকা রাস্তায় জনশূন্য এলাকা চিহ্নিত করে তারা এসব মিছিল করে আবার পালিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো সদস্যের এটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাইনি। আর সংশ্লিষ্ট থাকার সুযোগও নেই।