২০১৭ সালে ভারত থেকে ছয়টি সায়ন নিয়ে আসেন হর্টিকালচার সংশ্লিষ্ট মাইনুল ইসলাম। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের রবিউল ইসলামের বাগানে সেগুলো টেপ বা কলম করা হয়। ধীরে ধীরে গাছ বাড়ে, ফলন আসে, পরিচিতি পায় আমটি। এরপর সায়ন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে বিভিন্ন বাগানে।
রবিউল ইসলামের নিজের বাগানেই এখন কল্যাণভোগের চাষ বিস্তৃত হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে সায়ন নিয়ে আশপাশের চাষিরাও নতুন বাগান গড়ে তুলেছেন। মাইনুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, রবিউলের কাছ থেকে সায়ন নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জোইট্যাবটতলায় একজন উদ্যোক্তা প্রায় চার বিঘা এবং সুলতানগঞ্জে শিক্ষক মরিফুল ইসলাম প্রায় ৩৫ বিঘা জমিতে কল্যাণভোগের বাগান করেছেন।
স্বাদ ও দামে আলাদা পরিচিতি
চাষিদের কাছে কল্যাণভোগের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর স্বাদ। অনেকেই এটিকে ক্ষিরসাপাত আমের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে স্বাদের পাশাপাশি অফ-সিজনে ফলন হওয়ায় বাজারেও তৈরি হয়েছে আলাদা চাহিদা।
সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও এই আম পাওয়া যায়। অন-সিজনেও ফলন হয়, তবে তখন বাজারে অন্যান্য জাতের আম থাকায় দাম তুলনামূলক কম থাকে।
বর্তমানে কল্যাণভোগ আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ প্রায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা দরে। গত বছর একই আমের দাম ছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা মণ। অনলাইন বিক্রির কারণে বাগান থেকেই বড় একটি অংশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
গোমস্তাপুরের খয়রাবাদ এলাকায় কল্যাণভোগের বাগান করা রবিউল ইসলাম জানান, এবার তাঁর প্রকল্পে প্রায় ১০০ মণ আম উৎপাদনের আশা করছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৩০ মণ আম বিক্রি করেছেন। প্রতি মণ ১৬-১৭ হাজার টাকা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৩৪০ টাকা দরে আম বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।
রবিউল বলেন, “আমার বাগানের আম বাজারে তেমন নিয়ে যেতে হয় না। অনলাইনেই বেশির ভাগ আম বিক্রি হয়ে যায়।”
আমের চেয়ে সায়ন-চারায় বেশি আয়
কল্যাণভোগের বাণিজ্য শুধু আম বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সায়ন ও চারারও তৈরি হয়েছে আলাদা বাজার।
রবিউল ইসলামের হিসাবে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার সায়ন বিক্রি করেছেন তিনি। সামনে আরও প্রায় ২০ হাজার সায়ন বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে একেকটি সায়ন ১৫-২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও কয়েক বছর আগে এর দাম ছিল ১০০ টাকা পর্যন্ত।
এ পর্যন্ত প্রায় ৩২ হাজার চারা বিক্রি করেছেন বলেও জানান তিনি। আকার ও বয়সভেদে প্রতিটি চারার দাম ১৫০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত।
রবিউলের ভাষায়, “আমি শুধু আম বিক্রি করি না, সায়ন ও চারাও বিক্রি করি। অনেক সময় সায়ন ও চারা বিক্রি করে আমের চেয়েও বেশি আয় হয়।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন আমরা ইতিমধ্যে কল্যাণ ভোগের কিছু চারা কৃষক পর্যায়ে পর্যায়ে বিতরণ করেছি
এক ডগায় একাধিক আম
কল্যাণভোগ গাছের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—একটি ডগায় শুধু একটি আম নয়, একাধিক আম ধরতে দেখা যায়। গাছে ধরনও ভালো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাত-আট বছরের গাছে ২৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের আম পাওয়া যাচ্ছে।
চাষিদের দাবি, আমের খোসা তুলনামূলক মোটা হওয়ায় পোকার আক্রমণে ক্ষতির পরিমাণও অন্য অনেক জাতের তুলনায় কম। আঁটি ছোট হওয়ায় আমের খাওয়ার উপযোগী অংশও বেশি।
উদ্যোক্তাদের মতে, প্রচলিত কিছু জাতের তুলনায় কল্যাণভোগ উৎপাদনে খরচও তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে বড় পরিসরে এ জাতের উৎপাদন খরচ, ফলন ও লাভজনকতা নিয়ে আরও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন চাষিরা
কল্যাণভোগের চারা ও সায়নের চাহিদা যে শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা চাষিদের উপস্থিতিতে।
নওগাঁর সাপাহার থেকে রবিউলের বাগানে এসেছিলেন কামাল পাশা ও সবুর মাস্টার। কামাল পাশা জানান, এর আগে তিন হাজার চারা নিয়ে গিয়ে বাগানে টেপ করেছেন। আরও গাছে জাত পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এজন্য এবার পাঁচ হাজার সায়ন নিতে এসেছেন।
কামাল পাশা বলেন, “আমটি দেখেছি, শুনেছি এবং খেয়েছি। অসাধারণ সুস্বাদু। ক্ষিরসাপাত আমের মতো স্বাদ।”
শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিনও কল্যাণভোগের চারা নিয়েছেন। তিনি জানান, প্রায় তিন মাস আগে ১০০টি চারা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিজের অন্য বাগানের ফাঁকা জায়গায় এসব চারা রোপণ করবেন।
জালাল উদ্দিন বলেন, “আগে আমটি খেয়ে দেখেছি। স্বাদ অসাধারণ। সেই স্বাদ থেকেই চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
পুরোনো জাত থেকে নতুন জাতের দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদন অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের জাত পরিবর্তনের প্রবণতা গত কয়েক বছরে বেড়েছে। বিশেষ করে যে সব পুরোনো জাতের আমে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারমূল্য কম, সেসব গাছের পরিবর্তে নতুন ও তুলনামূলক বেশি দামের জাতের দিকে ঝুঁকছেন অনেক চাষি।
এক্ষেত্রে পুরো গাছ কেটে নতুন গাছ লাগানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। পুরোনো আমগাছেই সায়ন সংযোজন বা ডগা টেপের মাধ্যমে জাত পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন তাঁরা।
ব্যানানা, গৌড়মতি, বারি-৪, আম্রপালি, কাটিমনসহ বিভিন্ন নতুন জাতের পাশাপাশি কল্যাণভোগের দিকেও আগ্রহ বাড়ছে।
এর বিপরীতে লখনা, আশ্বিনা, ফজলি, মোহনভোগ, দাইদভোগ ও বোগলাগুঠির মতো কিছু পুরোনো জাতের গাছ কেটে ফেলার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য।
ছয় সায়নের গল্প এখন বৃহত্তর সম্ভাবনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন, বাজারমূল্য ও লাভের হিসাব নিয়ে চাষিদের উদ্বেগ রয়েছে। অনেক চাষি কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় আম ব্যবসা থেকে সরে গেছেন। সেই বাস্তবতায় নতুন জাতের আম চাষে বাড়তি দাম ও অফ-সিজন বাজার ধরার সুযোগ চাষিদের নতুন করে আগ্রহী করে তুলছে।
কল্যাণভোগের যাত্রাটিও শুরু হয়েছিল খুব ছোট পরিসরে—মাত্র ছয়টি সায়ন দিয়ে। কয়েক বছরের মধ্যে সেই সায়ন থেকে তৈরি হয়েছে ৭৫ বিঘারও বেশি বাগান। বিক্রি হয়েছে হাজার হাজার সায়ন ও চারা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা আসছেন নতুন এই জাতের সন্ধানে।
তবে এই সাফল্যের গল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। নতুন জাতটি কতটা দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক, বিভিন্ন মাটিতে এর ফলন কেমন, রোগবালাই ও জলবায়ুর প্রভাব কতটা এবং বড় পরিসরে বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।