বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা আবাসন খাতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণে হওয়া বিনিয়োগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রড, সিমেন্ট, টাইলস, সিরামিকসহ ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এ খাতের সংকট শুধু নির্মাণশিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন খাত যেকোনো দেশের অর্থনীতির ‘রিয়েল সেক্টর’ বা প্রকৃত উৎপাদনশীল খাত। কিন্তু বর্তমানে দেশে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও এই পতনের হার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। আগে যেখানে মাসে গড়ে ১,০০০টি ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ৫০০টির কাছাকাছি নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার।
সংকটের প্রধান কারণ
ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে—
নির্মাণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি:
রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ও পাথরের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
উচ্চ সুদহার:
ব্যাংকঋণের সুদহার ৯-১০ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগ ও ক্রেতা উভয়ের জন্যই বড় প্রতিবন্ধকতা।
অতিরিক্ত নিবন্ধন ব্যয়:
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে আবাসন খাতের নিবন্ধন ব্যয় অন্যতম সর্বোচ্চ, যা ১৩ শতাংশেরও বেশি।
বাজেটজনিত চাপ:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রড উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট এবং স্ক্র্যাপ আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব আবাসন খাতের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এফএআর (FAR) হ্রাস:
ফ্লোর এরিয়া রেশিও কমিয়ে দেওয়ায় বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ সীমিত হয়েছে। ফলে জমির মালিক এবং উদ্যোক্তা উভয়ের আগ্রহ কমছে।
বিশাল কর্মসংস্থান ও রাজস্বের উৎস
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো আবাসন খাত। বর্তমানে এ খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকার বেশি। প্রায় ১,৪০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। খাতটি প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব প্রদান করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে।
তবে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে বাংলামোটরসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আবাসন খাত জিডিপির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। চীনে এ খাতের অবদান ২৩ থেকে ২৮ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতেও এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা বলছে, আবাসন খাতে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগ অর্থনীতিতে প্রায় ২.৫ টাকার বেশি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।
খাতটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন—
১. নিবন্ধন ব্যয় কমানো: রিহ্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী নিবন্ধন ব্যয় ১৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা।
২. স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ: মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য সহজ শর্তে আবাসন ঋণের ব্যবস্থা করা।
৩. করনীতিতে নমনীয়তা: আবাসন খাতকে চাঙ্গা করতে সাময়িক কর-সুবিধা দেওয়া, যাতে খাত সচল হওয়ার পর লিংকেজ শিল্প থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়।
৪. একীভূত ও প্রযুক্তিনির্ভর নীতি: একটি স্বচ্ছ, পেশাদার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যা প্রকৌশলী, স্থপতি এবং দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
উপসংহার
সময়সম্মত সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা ছাড়া আবাসন খাতের বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই বাজেট-পরবর্তী আলোচনা ও নীতিনির্ধারণে এ খাতের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।