দেশভাগের পর ৭৯ বছর পেরিয়ে গেলেও মুহুরীর চরের প্রায় দুই কিলোমিটার সীমান্ত নিয়ে জট কাটেনি। এর মধ্যে দুই দেশের মধ্যে হয়েছে একাধিক চুক্তি, প্রটোকল ও যৌথ জরিপ। সীমারেখা চিহ্নিত করতে বসানো হয়েছে অস্থায়ী খুঁটিও। কিন্তু স্থায়ী সীমান্ত পিলার না বসায় মাঠপর্যায়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।
মুহুরীর চর নিয়ে বিরোধের ইতিহাস দেশভাগের পর থেকেই। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এ চরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে সীমারেখা নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির পরও সমস্যাটি পুরোপুরি মেটেনি। পরে ২০১১ সালের প্রটোকলের মাধ্যমে মুহুরীর চরের জমি নিয়ে নতুন করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মুহুরীর চরের মোট আয়তন ৯২ দশমিক ১৪ একর। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ৭১ দশমিক ৯৪ একর এবং ভারতের অংশ ২০ দশমিক ২০ একর নির্ধারণ করা হয়।
এরপর ২০১৪ সালের ১৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি দুই দেশের জরিপ বিভাগ যৌথভাবে জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ভিত্তিতে সীমারেখা চিহ্নিত করতে ৪৪টি অস্থায়ী কাঠের খুঁটি বসানো হয়। এসব খুঁটির জায়গায় পরবর্তী সময়ে স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে একের পর এক চুক্তি ও জরিপ হলেও মাঠপর্যায়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ৪৪টি অস্থায়ী খুঁটির অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। খুঁটিতে লাগানো জরিপ নম্বরের লোহার পাতেও ধরেছে মরিচা। অনেক জায়গায় খুঁটির অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এতে সীমারেখা নিয়ে মাঠপর্যায়ে জটিলতা আরও বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
কৃষকদের ভাষ্য, কাগজপত্রে জমির মালিকানা থাকলেও নিরাপদে সেখানে যাতায়াত করতে না পারায় চাষাবাদ বন্ধ। ফলে বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে আছে জমি। অনেক পরিবারের জমি থাকলেও সেখান থেকে কোনো আয় করতে পারছেন না তারা।
তাদের প্রশ্ন, যৌথ জরিপের মাধ্যমে যখন জমির সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, তখন স্থায়ী সীমান্ত পিলার বসিয়ে কেন বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধান করা হচ্ছে না?
মুহুরীর চরের সমস্যা শুধু কৃষকের জমির ভোগদখলেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের মতে, স্থায়ী সীমান্ত চিহ্ন না থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
সীমান্তের অনির্দিষ্ট বা দুর্বলভাবে চিহ্নিত অংশকে কেন্দ্র করে চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
মুহুরীর চরকে ঘিরে অতীতেও দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা ও গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা এই সীমান্ত সমস্যা শুধু কয়েক একর জমির মালিকানা বা কৃষকের চাষাবাদের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই দেশের স্থানীয় পর্যায়ের সম্পর্কও জড়িত।
মুহুরীর চরের কৃষকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ- নিজেদের নামে জমি থাকার পরও তারা সেটি ব্যবহার করতে পারছেন না।
কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জন্য জমি শুধু সম্পদ নয়, জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ সীমান্ত জটিলতার কারণে সেই জমি থেকে উৎপাদন বা আয়- কোনোটিই করতে পারছেন না অনেক পরিবার।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় থাকলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব কম। অস্থায়ী খুঁটিগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন স্থায়ী সীমান্ত চিহ্ন স্থাপন আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।
মুহুরীর চর নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চুক্তি, প্রটোকল ও যৌথ জরিপ হয়েছে। জমির অংশও নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরও কেন স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ ও কৃষকদের জমি ব্যবহারের বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান হয়নি- এ প্রশ্নই এখন সামনে।
জমির মালিকদের দাবি, দুই দেশের সমন্বয়ে দ্রুত স্থায়ী সীমান্ত চিহ্ন স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি কাগজপত্রে যাদের মালিকানা রয়েছে, তাদের জমিতে নিরাপদে যাতায়াত ও চাষাবাদের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই সীমান্ত জটকে আর ঝুলিয়ে না রেখে কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কারণ মুহুরীর চরের সমস্যা এখন আর শুধু একটি সীমান্তরেখার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের জমির অধিকার, জীবিকা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত অধ্যায়।