২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি বিশ্বায়নের নতুন মানচিত্র, বাণিজ্যের বিস্তার, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা এবং ফুটবলের আত্মাকে নিয়ে এক জটিল বিতর্কের নাম।
প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। আয়োজক তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।
প্রশ্ন হলো—বড় মানেই কি ভালো?
তিন দেশের বিশ্বকাপ, এক পৃথিবীর আয়োজন
মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়াম একসময় দেখেছে দিয়েগো ম্যারাডোনার "হ্যান্ড অব গড"। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়ামগুলো দেখেছে সুপার বোলের উন্মাদনা। কানাডা ফুটবলকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে।
এই তিন দেশের যৌথ আয়োজন যেন উত্তর আমেরিকার এক সাংস্কৃতিক জোট।
১৬টি স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে পড়বে ফুটবলের উৎসব। হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেবে দলগুলো। এক শহর থেকে আরেক শহরে উড়ে বেড়াবে সমর্থকেরা। কেউ বলছেন, এটি বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক করে তুলবে। আবার সমালোচকদের মতে, এতে হারিয়ে যেতে পারে বিশ্বকাপের অন্তরঙ্গতা।
৪৮ দলের বিশ্বকাপ: গণতন্ত্র নাকি ব্যবসা?
ফিফা বলছে, নতুন ফরম্যাট বিশ্ব ফুটবলকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। আগে যেসব দেশ বিশ্বকাপের স্বপ্নই দেখতে পারত না, তারাও এখন সুযোগ পাবে।
আফ্রিকা, এশিয়া ও কনকাকাফ অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ বেড়েছে। ছোট দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নের নতুন দরজা খুলছে।
কিন্তু সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি সত্যিই ফুটবলের উন্নয়নের জন্য, নাকি সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং বাজার সম্প্রসারণের হিসাব?
বিশ্বকাপ এখন কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প।
নতুন প্রজন্মের আগমন
একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, রোনালদো কিংবা মেসির গল্প।
২০২৬ বিশ্বকাপে আমরা হয়তো দেখব এক যুগের বিদায় এবং আরেক যুগের জন্ম।
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম আধুনিক মিডফিল্ডের প্রতীক। ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গতি ও সৃজনশীলতার নতুন ভাষা লিখছেন।
স্পেনের লামিন ইয়ামাল—যার বয়স এখনো কৈশোরের কাছাকাছি—হয়তো হয়ে উঠতে পারেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত নাম।
অন্যদিকে, লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে থাকবে এক আবেগঘন প্রশ্ন—
এটাই কি তাদের শেষ বিশ্বকাপ?
কারা এগিয়ে?
বিশ্বকাপের ইতিহাস শেখায়, ভবিষ্যদ্বাণী বিপজ্জনক।
তবুও বিশ্লেষণ বলছে, কয়েকটি দল অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে।
ফ্রান্স — প্রতিটি পজিশনে বিশ্বমানের বিকল্প রয়েছে।
স্পেন — তরুণ প্রতিভা ও কৌশলগত শৃঙ্খলার অসাধারণ সমন্বয়।
আর্জেন্টিনা — বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের জয়ের সংস্কৃতি এখনও অটুট।
ব্রাজিল — পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না।
সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট হিসেবে এই চার দলের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
তবে বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো—এখানে নিশ্চিত বলে কিছু নেই।
ডার্ক হর্সদের গল্প
২০২২ সালে মরক্কো বিশ্বকে শিখিয়েছিল যে স্বপ্ন দেখার জন্য ইতিহাসের ভার প্রয়োজন হয় না।
২০২৬-এ সেই ভূমিকায় থাকতে পারে নরওয়ে, সেনেগাল কিংবা কলম্বিয়া।
হয়তো কোনো অচেনা দল কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে নেবে।
কারণ ফুটবল মাঝে মাঝে সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোই উপহার দেয়।
শেষ পর্যন্ত, বিশ্বকাপ আসলে কী?
বিশ্বকাপ কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়।
এটি বাবার হাত ধরে প্রথম ম্যাচ দেখা শিশুর বিস্ময়। এটি অভিবাসী শ্রমিকের নিজের দেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকার গর্ব। এটি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে আলিঙ্গন। এটি হারের পরও পরের চার বছরের অপেক্ষা।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় হতে পারে। সবচেয়ে ব্যয়বহুলও হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ধারণ করবে অন্য কিছু—
এটি কি এখনো মানুষের স্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারে?
যদি পারে, তবে ৪৮ দল, ৩ দেশ কিংবা ১০৪ ম্যাচ—এসব কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে।
আর যদি না পারে, তবে ইতিহাস হয়তো লিখবে—ফুটবল বিশ্বকাপ বড় হয়েছিল, কিন্তু তার আত্মা ছোট হয়ে গিয়েছিল।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাওয়ার অনেক পরে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ আবারও বিশ্বকাপের গল্প বলবে।
কারণ ফুটবল শেষ পর্যন্ত ট্রফির গল্প নয়।
এটি মানুষের গল্প।