সিলেট বিভাগে গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর এই বৃষ্টির কারণে শুরু হয়েছে বন্যা । একই সাথে বাড়ছে নদ–নদীর পানি।
বরাক, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, গোয়াইন, পিয়ান, সারি, ধলাই নদী, আকালুকি,টাঙ্গুয়া, শনির হাওর, দেখার হাওর, নলুয়ার হাওর, পাকনা হাওরসহ বিভিন্ন নদী ও খাল-বিলের পানিও এক থেকে দেড় মিটারের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া। তিনি বলেন, এসব নদী আকারে ছোট। তাই ভারী বৃষ্টি হলে এভাবে পানি বেড়ে যায়। বৃষ্টি কমে গেলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন এই প্রকৌশলী।
আবহাওয়াবিদরা আরো জানান, সিলেটে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে এ বৃষ্টি যে কোনো এলাকায় একটানা হবে তা নয়। থেমে থেমে বিভিন্ন এলাকায় হতে পারে। বৃষ্টি চলতে পারে আগামী ৪ মে পর্যন্ত।
এদিকে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার গোগালীছড়া নদীতে প্রায় ১৫০ ফুট বাঁধ ভাঙনের ফলে ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সোমবার রাতে (২৭ এপ্রিল) মুষলধারে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে গোগালীছড়ার বাঁধ ভেঙে উপজেলার জয়চন্ডী ও সদর ইউনিয়নের ১৫টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া
ঢলের পানিতে মুন্সিবাজার ও পতনঊষারের অর্ধশতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ধলাই, লাঘাটা নদীসহ পাহাড়ি ছড়া সমুহে পানি বিপদ সীমার মধ্যে রয়েছে। এ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
গত কয়েকদিনে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখি ঝড়ে শমশেরনগর, পতনঊষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে গাছগাছালি ভেঙ্গে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মুন্সিবাজার এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে অন্ধকারের মধ্যে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে গাছ ভেঙ্গে পড়ায় সোমবার ভোর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কপথ বন্ধ হয়ে পড়ে। শমশেরনগর বিমান বাহিনী ইউনিটের পাশে রেলপথে গাছ ভেঙ্গে পড়ে ঢাকাগামী কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন ৪০ মিনিট আটকা পড়ে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হন হাজারো যাত্রীরা। এরআগে গত রোববারের কালবৈশাখি ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৫৫টি ঘর বিধ্বস্ত, বিদ্যুৎ লাইন ও ব্যাপক গাছগাছালি ভেঙ্গে পড়ে।
অপরদিকে, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বৃহৎ নলুয়া,মই ও পিংলার হাওড়সহ বিভিন্ন হাওড়ের পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সোমবার থেকে মঙ্গলবার হওয়া বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে এ ধান।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, নলুয়ার হাওড়ের ৫০ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ। জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে বহু কৃষক ধান তুলতে হিমশিম পাচ্ছেন। এরই মধ্যে টানা বৃষ্টিতে ফসলের কিছু ক্ষতি করেছে। তবে এখনই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছে না। নৌকা দিয়ে ধান তোলার চেষ্টা চলছে। এ বছর জগন্নাথপুর উপজেলায় ২০ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওড়সহ বিভিন্ন হাওরের নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে পাকা ধান নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। অনেক জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে, আবার কোথাও কোথাও ডুবুডুবু অবস্থায় রয়েছে—যে কোনো সময় পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে কাটা ধানও ঠিকমতো শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। খলায় রাখা ধান ভিজে গিয়ে গরম ধরে (গেরা উঠে) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে যারা আগাম ধান কেটে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন, তারাও এখন নতুন করে বিপাকে পড়েছেন।
দিরাই উপজেলার টাঙ্গুয়া, বাদালিয়া, বরাম, চাপতি, উদগল, কালিয়াগুটা, টাংনি ও সাকিতপুরসহ বিভিন্ন হাওরের নিচু এলাকাগুলোতে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে ছোট ছোট বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত দিরাই উপজেলায় মোট আবাদকৃত জমির পরিমাণ ৩০,১৭৮ হেক্টর। এর মধ্যে মাঠে দণ্ডায়মান ফসল রয়েছে ১৫,৩০১ হেক্টর এবং অতিবৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ১,১০০ হেক্টর জমি। বিভিন্ন হাওরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী—কালিয়াকুটা হাওরে মোট জমি ৭,৫০০ হেক্টর, কর্তন হয়েছে ৩,০০০ হেক্টর, অবশিষ্ট রয়েছে ৪,৫০০ হেক্টর এবং জলাবদ্ধকৃত জমি ১৯০ হেক্টর।বরাম হাওরে মোট জমি ২,৮০০ হেক্টর, কর্তন হয়েছে ১,৮০০ হেক্টর, অবশিষ্ট রয়েছে ১,০০০ হেক্টর এবং জলাবদ্ধকৃত জমি ৯৫ হেক্টর।চাপতি হাওরে মোট জমি ৪,৮৪০ হেক্টর, কর্তন হয়েছে ২,৮০০ হেক্টর, অবশিষ্ট রয়েছে ২,০৪০ হেক্টর এবং জলাবদ্ধকৃত জমি ১৫০ হেক্টর।উদগল হাওরে মোট জমি ৬০০ হেক্টর,কর্তন হয়েছে ৩২০ হেক্টর, অবশিষ্ট রয়েছে ২৮০ হেক্টর এবং জলাবদ্ধকৃত জমি ৮০ হেক্টর।
শান্তিগঞ্জ একটি হাওর বেষ্টিত এলাকা। এখানকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে অনেক জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে আধুনিক কৃষিযন্ত্র যেমন কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার ব্যবহার করে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এবং অতিরিক্ত শ্রম ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবীব জানান, এ বছর হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে মোট ২২ হাজার ৬১২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ১৮ হাজার ৩৮১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা সম্পন্ন হয়েছে—যা মোট আবাদকৃত ধানের প্রায় ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে নন-হাওর এলাকায় ৪ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে আবাদ হলেও এর মাত্র ১০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে এবং এসব জমি তেমন ঝুঁকিতে নেই।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে চলতি বোরো মৌসুমে সোনালী ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন হাওড়পাড়ের হাজারো কৃষক। একদিকে ধান কাটা শ্রমিকের তীব্র সংকট, অন্যদিকে বিরূপ আবহাওয়া, বজ্রবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে উপজেলার অন্তত হাজার ১ হাজার ২০০ থেকে ১হাজার ৫০০ হেক্টর জমির পাকা ধান এখন পানির নিচে। সারা বছরের শ্রম আর ঘামে উৎপাদিত ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সুত্র জানায়, সিলেটসহ সারা দেশে আগামী পাঁচ দিন বজ্রসহ বৃষ্টি ঝরতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও অতিভারি বর্ষণ হওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। তারা জানান, বুধবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিরাজমান লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ হতে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে—এ অবস্থায় আগামী তিন দিন ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।সেই সঙ্গে ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে।
এ ছাড়া শনিবার সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরদিন রবিবার সারা দেশে দিন ও রাতে তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। বর্ধিত পাঁচ দিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমতে পারে ও তাপমাত্রা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ইতিমধ্যে মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়েছে।