ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিম অ্যান্ড্রুজ নামের ওই ব্যক্তি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির জটিল রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের হিসাবে, পাঁচ বছরের মধ্যে মানব কিডনি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। বিপরীতে, অপেক্ষার তালিকা থেকে বাদ পড়া বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি ছিল ৪০ শতাংশের বেশি।
কিডনি প্রতিস্থাপন শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগীদের বেঁচে থাকা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। কিন্তু বিশ্বজুড়ে মানব কিডনির চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি।
ম্যাসাচুসেটসের অলাভজনক চিকিৎসাব্যবস্থা ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের চিকিৎসকরা ইউকাটান মিনিয়েচার প্রজাতির ‘উইলমা’ নামের একটি শূকরের কিডনি অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করেন।
মানবদেহের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে প্রতিস্থাপনের আগে কিডনিটির উৎস শূকরের জিনোমে ৬৯টি পরিবর্তন আনা হয়। এর কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ভাইরাস প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়। অন্যগুলো করা হয় মানবদেহের সঙ্গে অঙ্গটির সামঞ্জস্য বাড়ানো এবং রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার আক্রমণ বা অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি কমাতে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিস্থাপনের পর অ্যান্ড্রুজ ২৭১ দিন ওই কিডনি নিয়ে বেঁচে ছিলেন। এ সময়ে তাকে ডায়ালাইসিস করতে হয়নি। এর আগে জীবিত মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের সর্বোচ্চ নথিভুক্ত সময় ছিল এর চেয়ে অনেক কম।
প্রায় ছয় মাস পর শূকরের কিডনির রক্তনালিতে ক্ষতি দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তা গুরুতর হয়ে কিডনিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রতিস্থাপনের প্রায় নয় মাস পর কিডনিটি অপসারণ করা হয়।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের বাসিন্দা অ্যান্ড্রুজ এই প্রতিস্থাপনকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বেঁচে ছিলাম, আবার বলতে পারেন দীর্ঘদিন ধরে আমি জীবিত ছিলাম না।’
শূকরের কিডনি শরীরে থাকা অবস্থায় তিনি রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা এবং তার কুকুর কাপকেককে নিয়ে দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি করতে পারতেন।
এরপর কয়েক মাস ডায়ালাইসিস নেওয়ার পর তিনি মৃত মানবদাতার একটি কিডনি পান। দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী ছয় মাসের পর্যবেক্ষণে মানব কিডনিটি ভালোভাবে কাজ করেছে।
মানবদেহে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে দীর্ঘদিন ধরেই অঙ্গ সংকট মোকাবিলার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর আগে নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল।
২০২৪ সালে জীবিত মানুষের শরীরে প্রথম শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। ওই রোগী ৫২ দিন পর মারা যান। তবে তার মৃত্যু কিডনি প্রতিস্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। ল্যানসেটের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে কোনো গবেষণায় জীবিত মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি দুই মাসের বেশি কার্যকর থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।
অ্যান্ড্রুজের ঘটনাটি তাই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বিশেষ করে মানব কিডনির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি সাময়িকভাবে ব্যবহার করে ডায়ালাইসিস থেকে মুক্ত রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের সেন্টার ফর ট্রান্সপ্লান্টেশন সায়েন্সেসের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়েলা বলেন, কিডনির সংকট বর্তমানে প্রতিস্থাপন চিকিৎসার সবচেয়ে বড় সমস্যা। তার মতে, শুরুতে শূকরের কিডনি মানব কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ‘সেতু’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে এটিই স্থায়ী চিকিৎসা হিসেবেও ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনো মাত্র একজন রোগীর অভিজ্ঞতা। কোনো তুলনামূলক রোগীও ছিল না। রোগী নির্বাচন এবং নিবিড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মতো বিষয়গুলো ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
অ্যান্ড্রুজের শরীরে থাকা শূকরের কিডনি থেকে কোনো নতুন মানব-টিস্যুবিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে কোনো শূকরজাতীয় ভাইরাস বা অন্য রোগজীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি। ফলে পরবর্তী মানব কিডনি প্রতিস্থাপনে শূকরের কিডনি থাকার কারণে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হয়নি বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান