বিএনপি তখন ক্ষমতায়। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে, যখন ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ আমাদের উপমহাদেশ ও এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হচ্ছিল, তখন সরকারের একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ ইন্টারনেট সংযোগ থেকে বাদ পড়ে। যার খেসারত রাষ্ট্রকে এখনো দিতে হচ্ছে।
সে সময় (১৯৯২-১৯৯৩) সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ফাইবার-অপটিক লাইন স্থাপনের কাজ চলছিল। ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে সচিবদের পরামর্শ চান। সচিবরা তাকে ভুল পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই সংযোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের তথ্য অন্য দেশে পাচার হয়ে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই পরামর্শের ভিত্তিতে সংযোগ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশ প্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে পড়ে, যার প্রভাব এখনো আমরা অনুভব করছি।
পরবর্তী সরকার এই প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করে সংযোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ততক্ষণে সংযোগটি আর বিনামূল্যে পাওয়া যায়নি। ফলে তৎকালীন সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হয়।
২০২৬ সালে আবারও বিএনপি ক্ষমতায়। আবারও বাংলাদেশের সামনে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বেশ কিছু সুযোগ এসেছে। সরকার চাইলে এসব সুযোগ গ্রহণ করতে পারে, যা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর স্থাপনের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সড়কপথে চীনের সঙ্গে দ্রুত পণ্য আদান-প্রদান এবং সহজ যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এই করিডোর যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি আরও বেগবান হতে পারে। তবে এর সবই সম্ভব, যদি আমরা এই প্রস্তাবে সম্মতি দিই।
সর্বশেষ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় যে সুযোগটি এসেছে, তা হলো ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে যোগদানের প্রস্তাব। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশকে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সার্বভৌমত্ব রক্ষা বা বৈশ্বিক নিরাপত্তা জোরদারে এই জোট বাংলাদেশের জন্য ট্রাম্পকার্ড হতে পারে।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসলামিক রাষ্ট্রগুলোর এই নিরাপত্তা জোটে যোগদানের বিষয়টি ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে; তবে দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে একটি ঐতিহাসিক ও বিচক্ষণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ জড়িত।
পাকিস্তান যেভাবে আমেরিকা ও চীনের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, সেভাবেই আমাদেরও দক্ষ কূটনীতির মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গ দক্ষ হাতে মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এখানে পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রতিবেশীকে কৌশলগত চাপে রাখতে হলে বাংলাদেশকে এই জোটে যোগ দেওয়া এবং চীনের সঙ্গে করিডোর স্থাপনের প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্ত এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের হাতে।
লেখক: গবেষক, মিডিয়া ও সমাজকর্মী