সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬ ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

জাতীয়

রোমাঞ্চকর ক্রীড়া শহর বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি, সিটি করপোরেশনের আওতায় গেলে কি হবে!

রোমাঞ্চকর ক্রীড়া শহর বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি, সিটি করপোরেশনের আওতায় গেলে কি হবে!

রাজধানী ঢাকার বুকে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ক্রীড়া নগরী- বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি। প্রায় ৩০০ বিঘা জায়গাজুড়ে নির্মিত এই বিশাল কমপ্লেক্স এখন শুধু দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক স্পোর্টস সিটিতে পরিণত হয়েছে। ১৭টি খেলার জন্য ২৪টি আন্তর্জাতিক মানের স্থাপনা নিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রকল্প ইতোমধ্যেই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তবে বিস্ময়কর এই ক্রীড়া অবকাঠামো ঘিরে এখন নতুন আলোচনা- এত বড় ও পরিকল্পিত স্পোর্টস সিটি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সার্বিক ব্যবস্থাপনা কি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় যাবে? আর সেটি হলে বর্তমানের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ ও নিরাপত্তা আদৌ বজায় থাকবে কি না- তা নিয়েই উদ্বিগ্ন বাসিন্দারা।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ক্রীড়া নগরী

২০২১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। ক্রিকেট, ফুটবল, সুইমিং, হকি, অ্যাথলেটিকস, ফুটসাল, ব্যাডমিন্টন, বাস্কেটবল, কাবাডি, ভলিবল, স্কোয়াশ, মার্শাল আর্ট, জুডো, তায়কোয়ানদোসহ নানা খেলার জন্য এখানে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

ক্রিকেট অংশটিই যেন আলাদা এক বিস্ময়। সবুজ মাঠ, দোতলা প্যাভিলিয়ন, ওপেন গ্যালারি, বিশাল ইনডোর সুবিধা, আউটডোর পিচ- সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেট অবকাঠামো এখন এখানে। নিয়মিত বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজনের পাশাপাশি বসুন্ধরা ক্রিকেট নেটওয়ার্কের কার্যক্রমও চলছে পুরোদমে।

সাউথ জোনে নির্মাণাধীন ২৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। এর পাশেই রয়েছে অনুশীলন মাঠ ও ইনডোর নেট প্র্যাকটিস সুবিধা। বিপিএলের সাবেক চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্সও এখানে অনুশীলন করেছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের নতুন কেন্দ্র

বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা এখন বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম প্রধান ভেন্যু। জাতীয় স্টেডিয়ামের সংস্কার চলাকালে এটি বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এখানে অস্ট্রেলিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের মতো দেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেয়েদের সাফ টুর্নামেন্টও আয়োজন করা হয়েছে এই মাঠে। আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধার কারণে বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা এখন দেশের অন্যতম আধুনিক ফুটবল ভেন্যু হিসেবে পরিচিত।

এক ছাদের নিচে ২৪ ব্যাডমিন্টন কোর্ট!

স্পোর্টস সিটির আরেকটি বড় আকর্ষণ এক লাখ স্কয়ার ফিটের সুবিশাল ইনডোর কমপ্লেক্স। যেখানে একসঙ্গে ২৪টি ব্যাডমিন্টন কোর্ট পরিচালনা করা যায়। প্রয়োজনে এই কোর্টগুলোকে রূপান্তর করে আটটি মিনি ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

এছাড়া রয়েছে ১৬টি দৃষ্টিনন্দন প্যাডেল টেনিস কোর্ট, ফুটসাল মাঠ, বাস্কেটবল কোর্ট, হকি মাঠ, অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক, সুইমিংপুল, বিশ্ববিখ্যাত গোল্ডস জিম ফ্র্যাঞ্চাইজি, ইয়োগা সেন্টার, শিশুদের খেলার জোন, ফুড কোর্ট ও সিনেমা হল।

ক্রীড়া ও বিনোদনের এমন সমন্বিত আয়োজন দেশের অন্য কোথাও নেই বললেই চলে।

শুধু স্পোর্টস সিটি নয়, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরব্যবস্থা

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, গল্ফ ক্লাব, শপিংমল, সুপারশপ, আধুনিক রেস্টুরেন্ট ও বিনোদনকেন্দ্র। ফলে এটি এখন কার্যত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক নগরীতে পরিণত হয়েছে।

বাসিন্দাদের মতে, বসুন্ধরার সবচেয়ে বড় শক্তি এর পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। কঠোর নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুসংগঠিত সড়কব্যবস্থা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা রাজধানীর অন্য যেকোনো এলাকার তুলনায় অনেক উন্নত।

সিটি করপোরেশনের আওতায় গেলে কি সব ঢাকার অন্য এলাকা গুলোর মত নষ্ট হয়ে যাবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় গেলে এই পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে।

তাঁদের দাবি, বর্তমানে বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নিজস্ব অর্থায়নে নিরাপত্তা, রাস্তা, ড্রেন, সড়কবাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক নাগরিক সেবা পরিচালনা করছে। ফলে পুরো এলাকাটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে।

বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, সিটি করপোরেশনের আওতায় গেলে হকার, অবৈধ দোকানপাট, যানজট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়তে পারে। এতে বর্তমানের পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, “বসুন্ধরা এখন রাজধানীর মধ্যে এক টুকরো শান্তির নগরী। এখানে শিশু-কিশোররা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। গভীর রাতেও পরিবার নিয়ে বের হওয়া যায়। এই পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।”

সিটি করপোরেশন কি এই মান বজায় রাখতে পারবে?

বাসিন্দাদের প্রশ্ন, ঢাকার অন্যান্য এলাকায় যেখানে জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি, সেখানে সিটি করপোরেশন কীভাবে বসুন্ধরার বর্তমান মান ধরে রাখবে?

তাঁদের মতে, রাজধানীর বহু এলাকায় নাগরিক সেবা ও নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের অসন্তোষ রয়েছে। অথচ বসুন্ধরায় কঠোর ব্যবস্থাপনার কারণে অপরাধের হার তুলনামূলক কম এবং পরিবেশ অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত।

গোলাম মাওলা রনির মন্তব্য

সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি বসুন্ধরাকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, ধানমণ্ডিতে ৩০ বছর থেকেও আমি যে নিরাপত্তা পাইনি, বসুন্ধরায় এসে তা পেয়েছি। এখানে গত কয়েক বছরে এমন কোনো ঘটনা শুনিনি, যেখানে পুলিশের সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বসুন্ধরার মতো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা অনেক ক্যান্টনমেন্টেও নেই। এই সিস্টেম যেন ধ্বংস না হয়।

বাসিন্দাদের দাবি

বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, এলাকার বাসিন্দারা সিটি করপোরেশনের আওতায় যেতে চান না। একইসঙ্গে হোল্ডিং ট্যাক্স ও সার্ভিস চার্জ স্থগিত রাখারও দাবি জানানো হয়েছে।

বাসিন্দাদের মতে, তাঁরা শুধু একটি প্লট বা ফ্ল্যাট কেনেননি; বরং নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক একটি জীবনব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছেন। তাই বসুন্ধরার স্বকীয়তা ও পরিকল্পিত চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি ও আবাসিক এলাকার মতো বৃহৎ পরিকল্পিত প্রকল্প পরিচালনায় সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। তবে সেই কাঠামো কীভাবে গড়ে উঠবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।

একদিকে রয়েছে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে রয়েছে বর্তমান নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ রক্ষার উদ্বেগ। ফলে বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি ও আবাসিক এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় যাবে কি না-তা এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, নাগরিক স্বার্থ ও নগর পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।

আরও

দেশের প্রতিটি খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে: আইনমন্ত্রী

জাতীয়

দেশের প্রতিটি খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের আমলে সংঘটিত প্রতিটি খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে স...

২০২৬-০৮-১৬ ১৯:৪৫

বেসরকারি জ্বালানি আমদানিতে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে পূর্ণ আস্থা: অয়েল অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন

জাতীয়

বেসরকারি জ্বালানি আমদানিতে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে পূর্ণ আস্থা: অয়েল অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন

বেসরকারিভাবে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতে পূর্ণ আস্থা রয়েছে বল...

২০২৬-০৮-১৬ ১৮:৩২

বাংলাদেশের অর্থনৈতিতে মৎস খাতের ভূমিকা অপরিসীম: এমপি মান্নান

জাতীয়

বাংলাদেশের অর্থনৈতিতে মৎস খাতের ভূমিকা অপরিসীম: এমপি মান্নান

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে মৎস্য খাতের গুরুত...

২০২৬-০৮-১৬ ১৮:০৫

জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাত: সম্ভাবনার সঙ্গে বড় ঝুঁকিও

জাতীয়

জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাত: সম্ভাবনার সঙ্গে বড় ঝুঁকিও

বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি অনেকটাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর। শিল্পের উৎপাদন, কৃষির সেচ, পণ্য ও যাত্রী...

২০২৬-০৮-১৬ ১৫:২৯