রাশিয়া-চীন: ঘনিষ্ঠ, কিন্তু আনুষ্ঠানিক জোট নয়
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মস্কোকে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে আরও বেশি করে চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে চীনের জন্য রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় কৌশলগত অংশীদার।
কিন্তু রাশিয়া ও চীনকে ন্যাটোর মতো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। বরং দুই দেশের সম্পর্ককে এখন এমন একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে দেখা যায়, যেখানে পশ্চিমা চাপ মোকাবিলার স্বার্থ দুই পক্ষকে কাছাকাছি এনেছে।
এই ঘনিষ্ঠতা অবশ্য উপেক্ষা করার মতোও নয়। কারণ চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী এবং রাশিয়া তৃতীয়। ২০২৫ সালে চীন সামরিক খাতে আনুমানিক ৩৩৬ বিলিয়ন এবং রাশিয়া ১৯০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
ব্রিকস কি বিকল্প শক্তিকেন্দ্র
১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে সদস্যরা একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সংযম, সংলাপ ও কূটনীতির আহ্বানের পাশাপাশি একতরফা শুল্ক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবিও জোরালো হয়েছে।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলো বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ তাদের দখলে। ফলে এটি আর উপেক্ষা করার মতো কোনো আলোচনা ফোরাম নয়।
তবে ব্রিকসকে সরাসরি ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ বলাও সমস্যাজনক। ভারত ও ব্রাজিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে বেশি আগ্রহী; অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে পশ্চিমা প্রভাবের পাল্টা শক্তি হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে চায়। এমনকি বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ব্রিকস সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানও বিপরীত। অর্থাৎ ব্রিকসের শক্তি বাড়ছে, কিন্তু অভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি।
ভারত কোন দিকে
এই সমীকরণে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অবস্থান ভারতের। সাত বছর পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শনিবার নয়াদিল্লি পৌঁছেছেন। ২০২০ সালের গালওয়ান সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে তীব্র অবনতি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধীরে ধীরে কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে সীমান্ত বিরোধ ও নিরাপত্তাগত অবিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে।
একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও গভীর। ২০২৪-২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ভারত এখনো রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা।
এ কারণেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির কিছু বিষয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। রুশ জ্বালানি কিনতে থাকা দেশগুলোর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নিষেধাজ্ঞা বিল এগোচ্ছে, যার সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ভারত ও চীন রয়েছে।
তবে এর অর্থ ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে চীন-রাশিয়া শিবিরে চলে যাচ্ছে, এমন নয়। বরং ভারত তার পুরোনো কৌশলগত স্বাধীনতার নীতিই অনুসরণ করছে। সবার সঙ্গে সম্পর্ক, কারো পূর্ণ অনুসারী নয়।
যুক্তরাষ্ট্র কি দুর্বল হচ্ছে
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। চীন ও রাশিয়ার সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও তা অনেক বেশি। ২০২৬ সালের অনুমোদিত মার্কিন সামরিক ব্যয় আবার এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ডলারও রাতারাতি আধিপত্য হারাচ্ছে না। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বের ঘোষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল মার্কিন ডলারে।
তবে চাপ বাড়ছে। ইউক্রেন, ইরান, চীন, ইউরোপীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য বিরোধ একই সময়ে সামলাতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি নিয়েও পুনর্মূল্যায়ন চলছে। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রকে এখনই দুর্বল শক্তি বলা তথ্যসম্মত নয়। বরং বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের আপেক্ষিক একক আধিপত্য কমছে।
বিশ্ব এমন এক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটন শক্তিশালী থাকবে, কিন্তু একাই সব নিয়ম নির্ধারণ করতে পারবে না। রাশিয়া-চীনের ঘনিষ্ঠতা, ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং ভারতের মতো দেশের বহু-মুখী কূটনীতি সেই পরিবর্তনেরই লক্ষণ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পতনের গল্প নয়। এটি বরং ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ার গল্প। আর নতুন বিশ্বব্যবস্থা ঠিক কতটা বহুমেরু হবে, সেই লড়াই এখনো শেষ হয়নি।