২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেকের পর মেসির পথটা কখনোই সহজ ছিল না। ক্লাব ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের জার্সিতে শুরুটা ছিল অপেক্ষার। বড় ম্যাচে ব্যর্থতা, ফাইনালে হার আর শিরোপাহীনতার দায় বারবার এসে পড়েছে তার কাঁধে। এমনকি ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর অভিমানে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
সেই সিদ্ধান্ত অবশ্য স্থায়ী হয়নি। মেসি ফিরে এসেছিলেন। আর সেই ফিরে আসাই বদলে দেয় গল্পের শেষটা!
২০২১ সালের কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের পর যেন মেসির ক্যারিয়ার থেকে একটা ভার নেমে যায়। যে প্রশ্নটা তাকে বছরের পর বছর তাড়া করেছে-‘জাতীয় দলের হয়ে মেসি কী জিতেছেন?’-সেটির উত্তর তখন থেকে একের পর এক ট্রফি হয়ে আসতে থাকে। ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জেতা, একই বছর কাতারে বিশ্বকাপ জয়, এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকা-মাত্র চার বছরে আর্জেন্টিনার হয়ে চারটি বড় শিরোপা।
বিশেষ করে কাতার বিশ্বকাপ যেন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সেই শেষ অপূর্ণতাটুকুও মুছে দেয়। সাত ম্যাচের টুর্নামেন্টে তিনি শুধু দলকে নেতৃত্বই দেননি, জিতেছিলেন গোল্ডেন বলও। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুই গোল করে, টাইব্রেকারেও গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩-৩ সমতার পর পেনাল্টিতে ৪-২ জয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন।
সেই রাতের পর মেসির ক্যারিয়ারে যেন ‘কী জিততে পারেননি’ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। যে বিশ্বকাপের জন্য তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতে হয়েছে, সেটিও উঠে আসে তার হাতে। অথচ চার বছর পর বিদায়ের সময়ও তিনি বিশ্বকাপের ফাইনালে। এবার ফল তার পক্ষে যায়নি। স্পেনের কাছে ০-১ হেরে আর্জেন্টিনা হয়েছে রানার্সআপ। কিন্তু এখানেও মেসির ব্যক্তিগত যাত্রায় যোগ হয়েছে আরেকটি ইতিহাস-বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড!
শেষ ম্যাচে ট্রফি না থাকলেও মেসির শেষ বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে আরেকটি রেকর্ড নিয়ে।
এখানেই তার বিদায়ের তাৎপর্য। ২০১৬ সালে যে মেসি মনে করেছিলেন, জাতীয় দলকে আর কিছু দেওয়ার নেই, এক দশক পর সেই মেসিই বলছেন, এবার সত্যিই সময় এসেছে সরে দাঁড়ানোর। তবে এবার তার সিদ্ধান্তের পেছনে হতাশা নেই; আছে পূর্ণতার অনুভূতি।
অবসরের ঘোষণায় আজ মেসি লিখেছেন, ‘এটা এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা নিতে গিয়ে হৃদয়ে খুব কষ্ট হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছি, এখন আর দেওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।’ তার দাবি, ২১ জুলাই ফাইনালের দুই দিন পরই তিনি বিদায়ের বার্তাটি লিখেছিলেন। পরে বাবাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া পারিবারিক ঘটনার পর সিদ্ধান্তটি আরও দৃঢ় হয়।
এই কথাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। একসময় তিনি ছিলেন এমন একজন তারকা, যাকে প্রতিটি ব্যর্থতার পর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হতো। শেষদিকে তিনি হয়ে উঠলেন এমন এক অধিনায়ক, যার হাতে বিশ্বকাপ দেখে আর্জেন্টিনার মানুষ কেঁদেছে আনন্দে।
২১ বছরে ২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল-আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক হয়েই বিদায় নিচ্ছেন মেসি। তার ক্যারিয়ারকে শুধু পরিসংখ্যানে আটকে রাখাও তাই কঠিন। কারণ মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো ট্রফি নয়; আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় বদলে দেওয়া।
একসময় ‘মেসি শিরোপা জিততে পারেন না’-এই অভিযোগই ছিল তার সবচেয়ে বড় বোঝা। শেষ পর্যন্ত সেই মেসিই আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ এনে দিয়ে বিদায় নিলেন। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে যাওয়ার পরও তার বিদায়কে পরাজয়ের বিদায় বলা যাচ্ছে না।
কারণ কিছু গল্প ট্রফি দিয়ে শেষ হয়, কিছু গল্প শেষ হয় পূর্ণতা দিয়ে। মেসির আর্জেন্টিনা গল্পটা দ্বিতীয়টির।
এখন সামনে নতুন প্রজন্ম। মেসি নিজেও তার বিদায়ী বার্তায় তরুণদের জায়গা করে দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করা শুধু একজন নতুন ১০ নম্বরের দায়িত্ব হবে না। কারণ মেসি শুধু একটি নম্বর ছিলেন না, ছিলেন আর্জেন্টিনার এক যুগের প্রতীক।
২০১৬-এর অভিমান থেকে ২০২৬-এর শান্ত বিদায়-মেসির জাতীয় দল অধ্যায়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এখানেই। তিনি যখন ফিরেছিলেন, তখন কিছু প্রমাণ করার ছিল। যখন বিদায় নিলেন, তখন আর কিছুই প্রমাণ করার বাকি নেই।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ দৃশ্য তাই ট্রফি হাতে নয়, পরাজিত এক অধিনায়ক হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার অবস্থান বদলায়নি। বরং শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়েছে শুধু একটি ক্যারিয়ার নয়-শেষ হয়েছে এমন এক যুগ, যেখানে আর্জেন্টিনা আর মেসি প্রায় একই গল্পের দুই নাম! ফুটবল বেঁচে থাকলে মেসির নামটি নিতেই হবে!