রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ডও দুদকের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, “দুর্নীতি কোথায় হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা জড়িত—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করতে হবে।”
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা বিরাজ করেছিল। সেই সময়ের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডও জনস্বার্থে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে অভিযোগ করছেন না; বরং প্রকাশিত প্রতিবেদনকে সামনে রেখেই তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তাঁর মতে, কোনো সরকারই দায়মুক্তির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রস্তুত শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জবাবদিহির অভাবে দেশে “লুটেরা অর্থনীতি” ও “ক্রনি ক্যাপিটালিজম” বিস্তার লাভ করে। এ সময়ে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে এবং ১৫ বছরে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক পরিচালনা এবং মেগাপ্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে বর্তমান সরকার ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সবাই মিলে ওই সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছিল। সব বিষয়ে মতৈক্য না থাকলেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ পাঁচ বছর নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করেছিল, যা বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ ও আসল মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটকে “নিউ ইকোনমিক অর্ডারের বাজেট” হিসেবে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নতুন কোনো কর আরোপ করা হয়নি। ফলে বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেনি।
বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্মার্ট অর্থনৈতিক রূপান্তরের কথা তুলে ধরে তিনি সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন মডেলের উদাহরণ দেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকারও সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার কোনো সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। পাশাপাশি তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। থানায় মামলা গ্রহণেও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রয়োজন হয় না বলে দাবি করেন তিনি।