বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

অন্যান্য

মহিমান্বিত আশুরা: ইতিহাস, তাৎপর্য ও আত্মশুদ্ধির মহোৎসব

মহিমান্বিত আশুরা: ইতিহাস, তাৎপর্য ও আত্মশুদ্ধির মহোৎসব

ইসলামি শরিয়ত ও ইতিহাসের পাতায় হিজরি মহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ ‘পবিত্র আশুরা’ এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে অসংখ্য ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই দিনটি। মুসলিম উম্মাহর কাছে এটি একদিকে যেমন আল্লাহর অসীম কুদরত ও সত্যের বিজয়ের দিন, অন্যদিকে তেমনি এক চরম আত্মত্যাগ ও শোকাবহ স্মৃতির স্মারক।

আজকে আমরা আলোচনা করব পবিত্র আশুরার ঐতিহাসিক পটভূমি, এর রোজা রাখার নিয়ম, সরকারি ছুটির দিনে ইবাদতের আমল এবং সঠিক নিয়মে দিনটি যাপনের গুরুত্ব নিয়ে।

আশুরার ঐতিহাসিক পটভূমি

আশুরার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবজাতির ইতিহাসের বিশাল দুটি অধ্যায়; একটি আনন্দের ও সত্যের বিজয়ের, অন্যটি চরম ত্যাগ ও শোকের।

আশুরার মূল ঐতিহাসিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে বনী ইসরাঈলের মুক্তিকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন মিশরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের জুলুম থেকে বাঁচতে হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন অনুসারীদের নিয়ে লোহিত সাগরের তীরে পৌঁছান, তখন মহান আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে সাগরের বুকে ১২টি রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে সাগর পার হয়ে মুক্তি পান। অন্যদিকে, তাদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে সসৈন্যে সাগরে ডুবে মরে দাম্ভিক ফেরাউন। এই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজরত মুসা (আ.) মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখতেন।

আশুরার আরেকটি বড় এবং বেদনাবিধুর অধ্যায় হলো কারবালার প্রান্তরের ঘটনা। হিজরি ৬১ সনের এই ১০ মহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরুপ্রান্তরে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়তে গিয়ে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭২ জন পরিজন। কারবালার এই ট্র্যাজেডি উম্মাহকে চিরকাল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার ও আত্মত্যাগের এক মহান শিক্ষা দেয়।

আশুরার রোজার গুরুত্ব ও রাখার নিয়ম

রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখতে পান যে ইহুদিরা মুসা (আ.)-এর মুক্তির শুকরিয়া হিসেবে এই দিনে রোজা রাখছে। তখন তিনি বলেন, ‘মুসা (আ.)-এর অনুসরণে আমাদের অধিকার তোমাদের চেয়ে বেশি।’ এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজাই ছিল মুসলিমদের জন্য ফরজ। বর্তমানে এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ ইবাদত। হাদীস শরিফে এসেছে, আশুরার একটি রোজার বিনিময়ে মহান আল্লাহ বিগত এক বছরের গুনাহ খাতা মাফ করে দেন (সহীহ মুসলিম)।

রোজা রাখার সুন্নাহ নিয়ম

ইহুদিদের সংস্কৃতির সঙ্গে যেন মুসলিমদের ইবাদত মিলে না যায়, সেজন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) ১০ মহররমের আগের বা পরের দিনসহ মোট দুটি রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থাৎ ৯ ও ১০ মহররম, অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা সুন্নাত।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার যারা রোজা রাখছেন: ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এবার ১০ মহররম শুক্রবার হওয়ায় যারা বৃহস্পতিবার (৯ মহররম) রোজা রেখেছেন এবং শুক্রবার (১০ মহররম) রাখবেন; তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর সবচেয়ে উত্তম অনুসরণ করেছেন। তাদের এই নিয়মতান্ত্রিকতা ও ধর্মীয় সচেতনতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

শুক্রবার ও শনিবার যারা রাখতে চান: কোনো কারণে যারা বৃহস্পতিবার রোজা রাখতে পারেননি, তাঁরা শুক্রবার (১০ মহররম) এবং শনিবার (১১ মহররম) রোজা রাখবেন। ইসলামে কেবল এককভাবে শুক্রবার নফল রোজা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই জুমার দিনের রোজার সঙ্গে শনিবারের দিনটিকে যুক্ত করে দুটি রোজা পূর্ণ করার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। এতে সুন্নাহর পুরোপুরি আমল হয়ে যাবে।

সরকারি ছুটির দিনে ইবাদত-বন্দেগি ও ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা

এবারের পবিত্র আশুরার মূল দিনটি (১০ মহররম) শুক্রবার অর্থাৎ সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে পড়েছে। সাধারণত কর্মব্যস্ততার কারণে অনেকেই বিশেষ দিনগুলোতে ইবাদতের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। তবে এবার যেহেতু দিনটি ছুটির দিন, তাই অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও স্বস্তির সঙ্গে দিনটি কাটানো সম্ভব।

জুমার প্রস্তুতি ও আত্মশুদ্ধি: জুমার দিন নিজেই সপ্তাহের সেরা দিন। তার ওপর এটি আশুরার দিন। তাই সকাল সকাল পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে যাওয়া, জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বেশি বেশি দুরুদ পাঠ করা উচিত।

নফল ইবাদত ও কুরআন তিলাওয়াত: দিনের একটা বড় অংশ নফল নামাজ, তওবা-ইস্তিগফার, এবং অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করা যেতে পারে।

দোয়া ও মোনাজাত: ইফতারের আগের সময়টি দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। নিজের, পরিবারের এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে এই দিন আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করা উচিত।

ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল ও ইসলামের আলোয় সঠিক আমল

আমাদের দেশে পবিত্র আশুরাকে কেন্দ্র করে শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী ‘তাজিয়া মিছিল’ ও নানা আনুষ্ঠানিকতা বের হতে দেখা যায়। এটি মূলত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কারবালার শোক স্মরণের একটি প্রতীকী রূপ।

তবে ইসলামের মূল আলোয় ও বিশুদ্ধ সুন্নাহর মানদণ্ডে দিনটি পালনের সঠিক নিয়ম হলো উগ্রতা, বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, মর্সিয়া বা মাতম করা পরিহার করা। ইসলামে যেকোনো বিপদে বা শোকে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যেকোনো ধরণের অতিশয়োক্তি বা বাড়াবাড়িকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) যে সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন; সেই আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করাই হবে আশুরার প্রকৃত শিক্ষা।

পবিত্র আশুরা আমাদের শুধু অতীতের ইতিহাস স্মরণ করায় না, বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার প্রেরণা যোগায়। আসুন, আমরা রোজা পালন, নফল ইবাদত ও পরিচ্ছন্ন জীবন গঠনের মাধ্যমে এই মহিমান্বিত দিনের প্রকৃত কল্যাণ ও বরকত লাভ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক নিয়মে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

আরও

নেপালের রাষ্ট্রপতি-স্পিকারসহ ৩৬০ বিশিষ্টজনকে বাংলাদেশের আম উপহার

অন্যান্য

নেপালের রাষ্ট্রপতি-স্পিকারসহ ৩৬০ বিশিষ্টজনকে বাংলাদেশের আম উপহার

নেপালের কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাস এ বছরের ‘সিজন’স বেস্ট কমপ্লিমেন্টস উদ্যোগের আওতায় শুভেচ্ছা ও সৌহার্দ্যের কূটনৈতিক ন...

২০২৬-০৬-১২ ২৩:০২

ফেসবুক ডাউন, ভোগান্তিতে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা

অন্যান্য

ফেসবুক ডাউন, ভোগান্তিতে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা

বিভ্রাটের কবলে পড়েছে মেটার মালিকানাধীন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যা থেকেই প্ল্যাটফর্ম...

২০২৬-০৬-১২ ১৯:৫৯

চ্যানেল এইটটিনের বিশেষ আয়োজন: প্রিয় ফুটবল দলের আকর্ষণীয় ফটোফ্রেম বানাবেন যেভাবে

অন্যান্য

চ্যানেল এইটটিনের বিশেষ আয়োজন: প্রিয় ফুটবল দলের আকর্ষণীয় ফটোফ্রেম বানাবেন যেভাবে

চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় মেতেছে পুরো বাংলাদেশ। চায়ের দোকান থেকে কর্পোরেট অফিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বন্ধুদ...

২০২৬-০৬-১২ ১৩:০১