তাদের অন্তরে বিশ্বাসের বীজ ততদিনে শক্তভাবে গেঁথে গেছে। তবে একটি বৈরী সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে ইসলামকে প্রাতিষ্ঠানিক বা সমাজ পর্যায়ে রূপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ তৎকালীন সমাজব্যবস্থা এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের এই আহ্বানকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না।
এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে মদিনা থেকে আসা ১২ জনের একটি ছোট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করেন আল্লাহর রাসূল। তারা মহানবীর কাছে ইসলামের আনুগত্যের শপথ নেন। আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি তারা অঙ্গীকার করেন যে, তারা কখনো চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা, অপবাদ ও মিথ্যাচার করবেন না এবং সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ মেনে চলবেন।
ইতিহাসে এই ঘটনা আকাবার প্রথম বায়াত বা শপথ নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে এই শপথের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি মূলত হিজরতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। একই সঙ্গে এই ঘটনা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়, তা হলো—যেকোনো সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফল হতে হলে আগে নিজের আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নিষেধ করা বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা জরুরি।
মদিনায় ইসলামের আলো ও দ্বিতীয় শপথ
প্রথম শপথের পর মহানবী (সা.) মদিনায় দূত হিসেবে পাঠান মুসআব ইবনে উমাইরকে। মদিনার মাটি ইসলামের বাণীর জন্য দারুণ উর্বর প্রমাণিত হলো। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে অন্তত একজন করে মানুষ ইসলামের আলোয় দীক্ষিত হলেন।
এর পরের বছর মদিনার এক বিশাল দল মহানবীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এই দলে ছিলেন ৭২ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। তবে এবার তারা শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিতে আসেননি, বরং তারা এসেছিলেন আল্লাহর রাসূলকে মদিনায় আশ্রয় দেওয়ার এক বড় প্রস্তাব নিয়ে।
ইতিহাসে এটি আকাবার দ্বিতীয় বায়াত বা শপথ নামে পরিচিত। এই বৈঠকে মদিনার মুসলিমরা সব পরিস্থিতিতে রাসূলের আনুগত্য করার, সুসময় ও দুঃসময় নির্বিশেষে অর্থ ব্যয় করার, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার এবং আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে কারও লোকলজ্জা বা নিন্দার তোয়াক্কা না করার শপথ নেন।
মদিনাবাসীর জন্য এই সিদ্ধান্তের পরিণতি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর অর্থ ছিল স্পষ্ট—যারা মক্কায় রাসূলের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল, তারা এবার মদিনার দিকেও নজর দেবে।
কঠিন ত্যাগ ও হিজরতের প্রেক্ষাপট
মূলত আল্লাহর রাসূলকে জীবন দিয়ে রক্ষা করার এই প্রতিশ্রুতি মদিনার মুসলিমদের তৎকালীন মক্কার শক্তিশালী কাফের উপজাতিগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের মনের সুদৃঢ় বিশ্বাস ও ঈমানী শক্তি জাগতিক সব সুখ-আরাম বিসর্জন দিয়ে এই কঠিন অঙ্গীকারে অবিচল থাকতে সাহায্য করেছিল।
আকাবার দ্বিতীয় শপথ আমাদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। প্রথমত, যেকোনো সম্মিলিত কাজের জন্য একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো এবং একজন যোগ্য ও মান্যবর নেতা থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, একবার কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে নামলে জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে কখনো পিছু হটা যাবে না। তৃতীয়ত, সমাজ সংস্কার ও মানবতার কল্যাণে কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। আর সবশেষ শিক্ষা হলো, বাধা যতই আসুক, কোনো অবস্থাতেই দমে যাওয়া যাবে না।
ঘরবাড়ি ছেড়ে মদিনার পথে
মদিনায় ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর মক্কার সাহাবিদের জন্য হিজরত বা দেশান্তরের সময় ঘনিয়ে আসে। তবে নিজের চেনা শহর ছেড়ে যাওয়া মোটেও সহজ ছিল না। সাহাবিরা মক্কাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। জন্মভূমি মক্কায় শত নির্যাতন সহ্য করলেও সেখানে তাদের সাজানো সংসার ও দীর্ঘদিনের জীবন জড়িয়ে ছিল।
অন্যদিকে কুরাইশরাও চাচ্ছিল না মুসলিমরা মক্কা ছেড়ে যাক। কারণ মুসলিমরা মক্কা ছেড়ে চলে গেলে তাদের ওপর কুরাইশদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে এবং ইসলামের বিস্তার ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে সাহাবিদের সামনে রাতের আঁধারে সবকিছু ফেলে নিঃস্ব অবস্থায় মক্কা ছাড়ার কোনো বিকল্প ছিল না। শুধু আল্লাহর ইবাদত করার তাগিদে তারা এই বিশাল ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি হয়েছিলেন।
সুহাইব রুমির এক অনন্য ত্যাগ
এই ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন সাহাবি সুহাইব রুমি। ছোটবেলায় রোমান সাম্রাজ্যের দাস হিসেবে বন্দি ছিলেন তিনি। ২০ বছর বন্দিজীবনের পর সেখান থেকে পালিয়ে মক্কায় আসেন। এরপর নিজের কঠোর পরিশ্রমে মক্কার অন্যতম ধনী ও সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি।
মক্কার প্রতি ভালোবাসা থাকলেও ইসলামের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল আরও গভীর। প্রথম দিকের মুসলিম হওয়ায় আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে মদিনায় যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তার। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তিনি শুরুতে যেতে পারেননি। মহানবী মদিনায় চলে যাওয়ার পর কুরাইশরা ক্ষিপ্ত হয়ে সুহাইবের বাড়ির চারপাশে কড়া পাহারা বসায়।
এক রাতে সুহাইব কোনোমতে প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু কুরাইশরা তা টের পেয়ে দ্রুত তার পিছু নেয় এবং একটি পাহাড়ের পাদদেশে তাকে ঘিরে ফেলে।
সেখানে এক ঐতিহাসিক কথোপকথন হয়। সুহাইব তার ধনুক উঁচিয়ে কুরাইশদের সতর্ক করে বলেন, তোমরা যদি পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করো, তবে আমার ধনুকের তীর তোমাদের বুক ঝাঁঝরা করে দেবে।
কুরাইশরা জবাবে বলল, সুহাইব, তুমি মক্কায় এসেছিলে একদম গরিব ও দুর্বল অবস্থায়। এখানে এসে তুমি এত ধন-সম্পদ কামিয়েছ। আমরা তোমাকে এত ধন-সম্পদসহ বেঁচে ফিরতে দেব না।
সুহাইব তখন পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে বললেন, আমি যদি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ তোমাদের লিখে দিয়ে যাই, তবে কি তোমরা আমার পথ ছাড়বে?
কুরাইশরা এই শর্তে রাজি হয়ে গেল। সুহাইব তার জীবনের সব উপার্জন মক্কার কাফেরদের হাতে তুলে দিয়ে শূন্য হাতে মদিনার দিকে রওনা হলেন।
মদিনায় পৌঁছানোর পর আল্লাহর রাসূল তাকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বলেন, সুহাইব, তোমার এই ব্যবসা সফল হয়েছে। এরপরই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২০৭ নম্বর আয়াত নাজিল করেন, যার অর্থ হলো—মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের জীবনকে বিক্রি করে দেয়। আর আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।
বর্তমান মুসলিম উম্মাহর জন্য হিজরতের বার্তা
হিজরতের এই মহান সাফল্যই পরবর্তী সময়ে ইসলামী সভ্যতার বিকাশ ও প্রসারের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল। আজকের দিনে মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক সংকট উত্তরণে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গৌরব পুনরুদ্ধারে হিজরতের ঘটনা থেকে আমাদের কিছু বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন:
প্রথমত, আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে আল্লাহর অপছন্দনীয় সব কাজ বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, সমাজে সৎ কাজের প্রসার ও অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করতে হবে। চতুর্থত, যেকোনো বিপদে বা সংকটে ধৈর্য ও অবিচলতা বজায় রাখতে হবে। এবং পঞ্চমত, কোনো মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।