লন্ডনের বিভিন্ন কাউন্সিলের বিরুদ্ধে গৃহহীন ও অসহায় পরিবারগুলোকে শত শত মাইল দূরের শহরে পাঠিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক নতুন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডোমেস্টিক অ্যাবিউজ বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী, শরণার্থী এবং ছোট শিশু থাকা পরিবারগুলোকে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র এলাকাগুলোতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের চলমান তীব্র আবাসন সংকটের কারণে লন্ডনের বাইরে পাঠানো গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা গত দুই বছরে দ্বিগুণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অনেক পরিবারকে বোল্টন, ব্ল্যাকপুল ও হার্টলপুলের মতো দূরবর্তী এলাকায় কম খরচের এবং অত্যন্ত সীমিত সুবিধাসম্পন্ন বাসস্থানে পাঠানো হচ্ছে, যা নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মানবাধিকার ও আবাসন বিষয়ক সংগঠনগুলো স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর এ ধরনের পদক্ষেপকে অমানবিক বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজিতে দুর্বল কিংবা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ শরণার্থী ও অভিবাসী পরিবারগুলোকে এক প্রকার চাপের মুখে রেখে এই স্থানান্তরে রাজি করানো হচ্ছে। কোনো পরিবার যদি কাউন্সিলের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তবে তারা কার্যতই চিরতরে গৃহহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এদিকে উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও এই প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক পরিবারকে এসব এলাকায় স্থানান্তর করায় স্থানীয় আবাসন, শিক্ষা ও জনসেবামূলক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই সংকটের মাঝে একটি আলোচিত আইনি লড়াইয়ের বিষয় সামনে এসেছে, যেখানে মানব পাচার চক্রের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এক আলবেনীয় নারীকে পশ্চিম লন্ডনের ইলিং থেকে প্রায় ২৬০ মাইল দূরের কাউন্টি ডারহামে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। দুই সন্তানের জননী ওই নারী কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করে ঐতিহাসিক জয়লাভ করেন। আদালত পরে কাউন্সিলের ওই স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে রায় দেয়। আইন অনুযায়ী, কাউন্সিলগুলোকে আবাসন সংকটে পড়া মানুষদের জন্য যতটা সম্ভব নিজেদের এলাকায় বা কাছাকাছি স্থানে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হয়। তবে বিভিন্ন আবাসন আইনজীবী ও দাতব্য সংস্থার অভিযোগ, কিছু কাউন্সিল এই আইনি নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, কয়েকটি লন্ডন কাউন্সিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকায় এই নিম্নমানের বাসস্থানের ব্যবস্থা করছে। অনেক ক্ষেত্রে অসহায় পরিবারগুলোকে একমুখী বা ওয়ান-ওয়ে ট্যাক্সিতে করে সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তাদের কোনো সামাজিক যোগাযোগ, আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা নেটওয়ার্ক থাকে না। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মাত্র এক বছরে প্রায় ১,৩০০টি গৃহহীন পরিবারকে লন্ডনের বাইরে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল মাত্র ৬৭০। তবে আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত স্থানান্তরের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে।
আবাসন অধিকার কর্মীরা বলছেন, আবাসন সংকট মোকাবিলার নামে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক মানুষদের ওপরেই এই অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় কোপ পড়ছে। তারা বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে সামাজিক আবাসন নির্মাণ এবং গৃহহীনতা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের জোর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত কয়েকটি কাউন্সিল তাদের পক্ষে সাফাই গেয়ে জানিয়েছে যে, তারা চরম আবাসন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং আইন মেনেই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে গৃহহীন পরিবারগুলোকে অন্য এলাকায় পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিয়ম অনুযায়ী যথাযথভাবে অবহিত করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেছে।