ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোকান খুলে বসে থেকেও ক্রেতা মিলছে না। কোনো কোনো দোকানে দুপুর গড়িয়ে গেলেও দিনের প্রথম বিক্রি হচ্ছে না। অথচ দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতনসহ নিয়মিত খরচ মেটাতে হচ্ছে। এতে পুঁজি হারানোর পাশাপাশি ঋণের বোঝাও বাড়ছে অনেক ব্যবসায়ীর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার, ফুটপাতের সাশ্রয়ী বাজার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বিপণিবিতানের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী শপিংমলগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের বিস্তার কেনাকাটার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছে। ঘরে বসেই পণ্য পছন্দ করে অর্ডার দেওয়া এবং দোরগোড়ায় পৌঁছে পাওয়ার সুবিধায় ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অনলাইনমুখী হচ্ছেন। অন্যদিকে, বড় শোরুম ও বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর খরচ না থাকায় অনলাইনভিত্তিক অনেক বিক্রেতা তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন।
এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজারে কম দামে পোশাক, প্রসাধনসামগ্রীসহ নানা পণ্য পাওয়া যায়। ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্ত আয়ের ক্রেতাদের একটি অংশ অভিজাত শপিংমলের পরিবর্তে এসব বাজারে কেনাকাটা করছেন।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে খাদ্য, বাসাভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে। ফলে পোশাক, প্রসাধনী ও শৌখিন পণ্যের মতো খাতে ব্যয় কমিয়েছেন অনেকেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা ব্যবসায়।
অন্যদিকে, অভিজাত শপিংমলগুলোতে দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, জেনারেটর ও কর্মচারীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। বিক্রি কমলেও এসব খরচ নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে লোকসান সামাল দিতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স দীর্ঘদিনের লোকসান, ক্রেতাসংকট ও বকেয়া বিলের চাপের মুখে গত ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একসময়ের পরিচিত এই বিপণিবিতান বন্ধ হয়ে যাওয়াকে খুচরা ব্যবসার সংকটের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিনের লোকসানে অনেক ব্যবসায়ীর পুঁজি ক্ষয় হয়েছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক, আত্মীয়স্বজন কিংবা ব্যক্তিগত উৎস থেকে ঋণ নিয়েও অনেকে এখন তা পরিশোধ করতে পারছেন না। দোকানে পণ্য থাকলেও বিক্রি না হওয়ায় নগদ অর্থের সংকট তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পরিবারও পড়ছে চাপে। দোকানের আয় কমে যাওয়ায় বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে উঠছে। পাশাপাশি বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক দোকান মালিক কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ কেউ বন্ধ করে দিচ্ছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এতে কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন বিক্রয়কর্মীরাও।
ব্যবসায়ীদের এই সংকট থেকে উত্তরণে দোকানভাড়া ও সার্ভিস চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। মল কর্তৃপক্ষ ও দোকান মালিক সমিতির আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাড়া, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও জেনারেটর চার্জ পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে।
পাশাপাশি প্রথাগত ব্যবসার সঙ্গে অনলাইন বিক্রয়ব্যবস্থা যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শপিংমলের দোকানগুলোর জন্য যৌথ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো সহজ হতে পারে। শুধু কেনাকাটার জায়গা হিসেবে নয়, ফুডকোর্ট, বিনোদন ও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে শপিংমলগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগও প্রয়োজন।
এছাড়া সহজ শর্তে ঋণ, বিশেষ ছাড় ও উৎসবভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে পারেন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মল কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শপিংমলগুলোর সংকট শুধু কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লোকসানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ব্যবসায়ী ও কর্মচারীর জীবিকা। সময়োপযোগী উদ্যোগ, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং ব্যবসায়িক পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।