মাগুরা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, আমি যখন ২০১৮ সালে সীমাখালী বাজারে দোকান নিয়ে সাংবাদিকতা ও আয়ুর্বেদিক-ইউনানী চিকিৎসা দিতাম তখন হঠাৎ করে সীমাখালী বাজারে পত্রিকার এজেন্ট সাংবাদিক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডলের সাথে পরিচয় হয়। আর অল্প ৬ বছর সময়ের মধ্যে এসে তিনি আমার বন্ধুরমতো হয়ে গিয়েছিলেন, আমার দোকানে এসে শ্বাসকষ্টের আয়ুর্বেদিক সিরাপ নিতেন এবং বিভিন্ন সংবাদের লেখা সাজিয়ে নিয়ে যেতেন কম্পিউটারে এবং আমার কাছে থেকে নিয়মিত সংবাদের লেখা ও ছবি নিতেন। বাবু লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল আমাকে বলতেন ফারুক আহমেদ তোমার লেখা খুবই ভালো এবং সাহসের সাথে সংবাদ প্রকাশ হয় দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিন, দৈনিক গণমুক্তি, দৈনিক সমাজের কথা পত্রিকায়। আমি তোমার সংবাদ গুলো নিয়মিত পড়ি এবং ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি তুমি আমার থেকেও বড় মাপের সাংবাদিক হবে খুুলনা বিভাগের মধ্যে। ২০১৯ সালে সাংবাদিক গুরু লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল আমাকে ঢাকায় দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে দৈনিক খেদমত পত্রিকার সম্পাদক শরাফত ভাইয়ের সাথে বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী ভবনে পাঠিয়েছিলেন। ২০২০ সালে বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নে কৃষক সংগঠনের একটা অনুষ্ঠানে নিউজ প্রকাশ করার জন্য আমাকে দাওয়াত করেন এবং সেখানে উপস্থিত সবার সাথে বলে আমার প্রিয় পছন্দের ছোট ভাই সাংবাদিক ফারুক আহমেদ আমার অতন্ত্য আদরের ভাই, সেদিন আমি আবেগে আপ্লূত হয়ে ছিলাম তার আন্তরিকতা ব্যবহারে।
বাঘারপাড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক বাবু লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে খানপুর গ্রাম থেকে অবদান রাখেন। ১৯৮০ সাল থেকে বাবু লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল সাংবাদিক পেশায় যুক্ত হন এবং বাঘারপাড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম একজন এবং নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। এছাড়া পার্শবর্তী উপজেলা শালিখা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ছিলেন। অত্র অঞ্চলের রাজনীতি, সাহিত্য, সাংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলন সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী ও কালের সাক্ষী ছিলেন সাংবাদিক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল। গত ২০২৪ সালের ১৪ মে তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন অনন্তলোকে। কবি,
লেখক, সাংবাদিক ও কৃষক সংগঠক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল ১৯৬০ সালের ১৮ মে যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের খানপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা অভিলাষ মন্ডল ও মাতা কালীদাসী মন্ডল। পেশা হিসেবে ছাত্র জীবনেই সাংবাদিকতাকে বেছে নেন। সেই সাথে সংবাদপত্রের এজেন্সি ব্যবসার সাথেও জড়িত ছিলেন।
গ্রামের প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে নারিকেলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। এরপর যশোর সরকারি এম এম (মাইকেল মধুসূদন) কলেজ থেকে ১৯৭৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যশোর সিটি কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৮১ সালে তিনি অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্র অবস্থায় তার লেখা প্রথম গ্রন্থ 'বিবেকের বাণী' প্রকাশিত হয়। সেই সাথে সাংবাদিকতা শুরু করেন যশোর থেকে প্রকাশিত সমাচার সমীক্ষা ও সাপ্তাহিক বহ্নি পত্রিকায় । সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাহিত্য সাময়িকী পরিক্রমা, ক্ষণিকা ও উচ্চারণ নামের পত্রিকা। নিজেও কবিতা লেখায় আত্মনিয়োগ করেন এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তার লেখা কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে।
এরপর তিনি যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফুলিঙ্গ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলারবানী পত্রিকার বাঘারপাড়া প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় যথেষ্ট যশখ্যাতি অর্জন করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সংবাদপত্রের এজেন্টের ব্যবসা শুরু করেন। এর ফলে দেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকার সাথে যোগসূত্র তৈরি হয়। যশোর জেলার দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকা ১৯৯৭ সালে তাকে শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে পুরস্কৃত করে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই তিনি ঐ দৈনিক লোক সমাজ পত্রিকার আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে শালিখা উপজেলা অফিসে দায়িত্বরত ছিলেন। এছাড়াও দৈনিক বাংলার বানীর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকার বাঘারপাড়া ও শালিখা উপজেলার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়াও যশোরের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা ' দৈনিক গ্রামের কাগজ' এর স্টাফ রিপোর্টার হিসাবেও কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি শালিখার সীমাখালী বাজারে সংবাদপত্রের এজেন্সি ব্যবসার মাধ্যমে বাঘারপাড়া ও শালিখা উপজেলার অসংখ্য পাঠকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করছিলেন। তার নিজের রচিত 'আজকের ছড়া' ও 'কবিতালাপ' গ্রন্থ দুটি পাঠকের কাছে নন্দিত ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
এছাড়াও ১৯৯৯ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসে ‘লতিফ শাহ একজন সোনার মানুষের গল্প ‘ গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয় তাকে নিয়ে। এসবের পাশাপাশি ২০০১ সালে যশোরের গাইদঘাটে ‘কৃষি প্রযুক্তিবাস্তবায়ন কেন্দ্র’ নামের একটি কৃষি ও কৃষিকল্যাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এলাকার কৃষকদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ৬৪ টি কৃষি ক্লাব গড়ে তোলেন। যশোর সদর, বাঘারপাড়া, শালিখা ও কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করে এসকল কৃষিক্লাব গড়ে তুলে কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ ও কৃষকদের নিয়ে কৃষির উন্নয়নে নিবেদিত হন। বিশেষকরে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছেন। বৃহত্তর যশোর জেলায় বিষ মুক্ত সবজি উৎপাদনের জন্য কৃষক সংগঠক আইয়ুব হোসেন ও সাংবাদিক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল কে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ২০১০ সালে পুরস্কৃত করেন। ৬৪ টি কৃষি ক্লাবের মনিটরিং সেন্টার গাইদঘাট কৃষি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন কেন্দ্র স্থাপনের শুরু থেকেই এর সাধারন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করে গেছেন তিনি নিষ্ঠার সাথে।
গত কয়েক বছর ধরে সাংবাদিক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল দাদা অসুস্থ ছিলেন। আগের মত দৌড়ে বেড়াতে পারতেন না। করোনার আগে ২০১৯ সালে ভারতের ভেলোর থেকে চিকিৎসা করে এসেছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ও সীমাখালী বাজারে গেলেই তার সাথে দেখা করে আসতাম। জীবনের অপূর্ণ অনেক ইচ্ছের কথা ব্যাক্ত করতেন। বাঘারপাড়া উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার খুব ইচ্ছে ছিল তার। প্রাণবন্ত সাংবাদিক লক্ষণ চন্দ্র মন্ডল দাদা কে দেখেছি সেই দাদা কে যখন অসুস্থ দেখতাম তখন আমি মানসিকভাবে কষ্ট পেতাম, সীমাখালী বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুলতান ভাই আমাকে বলতেন দাদার শরীরের শক্তি দিন দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে কবে যে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে সেও দুঃখ ও কষ্ট হৃদয়ে অকপটে স্বীকার করেছে সাংবাদিক লক্ষণ দাদা নিতান্তই একজন ভালো মনের সৎ মানুষ। জীবনের শেষ দিন গুলোতে তিনি ঢাকাতে ছেলে সুব্রত শুভাশীষ মন্ডল(জয়ন্ত)’ র বাসায় কাটিয়েছেন। কিন্তু খানপুর গ্রামে এলাকায় ফেরার জন্য তার মনপ্রাণ উন্মুখ হয়ে থাকতো। অল্প ৬ বছর সময়ে আমার কাছে তাকে দেখে আমার মনে হয়েছে দাদা ছিলেন একজন বিরাট মাপের দেশপ্রেমিক এবং গণমানুষের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব ও ভালো মনের একজন প্রকৃত সৎ মানুষ। বাঘারপাড়া, শালিখা এলাকার মানুষের জন্য তার অবদান চির স্বরণীয় হয়ে থাকবে। এলাকার মানুষের উন্নয়নে তার যে ভূমিকা সেইসব বিবেচনায় তিনি নিঃসন্দেহে একজন বড়মাপের মানুষ, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এবং স্মরনীয় হয়ে থাকবেন।