ভিডিওতে দেখা যায়, বিদেশি প্রতিনিধিদলগুলো একে একে খামেনির কফিনের কাছে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করার সময় প্রতিটি প্রতিনিধিদলের প্রবেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।
রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায়, বিদেশি প্রতিনিধিদলগুলো যখন একের পর এক আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিনের কাছে গিয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, তখন প্রতিটি প্রতিনিধি দলকে পবিত্র আল কোরআনের আলাদা আলাদা আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে।
বিষয়টি ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকের মতে, এসব আয়াত নির্বাচন ধর্মীয় প্রতীকবাদের মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের কৌশলেরই একটি উদাহরণ।
৯ দেশকে কোরআনের ৯ আয়াতের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক বার্তা
১. আফগানিস্তান (সূরা আল-ফাতাহ, আয়াত: ১) আয়াতের অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ) একটি স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছি।
আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নেতৃত্বে তালেবান প্রতিনিধিদল যখন হলে প্রবেশ করেন, তখন তাদের এই আয়াত শোনানো হয়। ২০ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে তাড়িয়ে আফগানিস্তানের যে ঐতিহাসিক বিজয়, এই তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইরান সরাসরি তাদের সেই লড়াইকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক অনন্য "বিজয়ের অভিনন্দন" জানিয়েছে।
২. বাংলাদেশ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭০) আয়াতের অর্থ: আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা নিজেদের রবের নিকট জীবিত, তারা রিযিকপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পেছনে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি (অর্থাৎ জীবিত আছে), তাদের জন্য তারা এ সুসংবাদ গ্রহণ করে যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।
বাংলাদেশের জন্য এই আয়াতটি ছিল এক অনবদ্য প্রতীকী স্বীকৃতি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব এবং জালিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, ইরানের এই আয়াত তিলাওয়াত সরাসরি সেই শহীদদের আত্মত্যাগকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক আধ্যাত্মিক সম্মান এনে দেয়।
৩. ফিলিস্তিন (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১) আয়াতের অর্থ: পরম পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সামনে ইসলামের প্রথম কিবলা আল-আকসার আয়াতটি তিলাওয়াত করার অর্থ ছিল অত্যন্ত গভীর। এর মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, খামেনির বিদায়ের পরেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং জেরুজালেম মুক্ত করার লড়াই ইরানের কাছে সবচেয়ে পবিত্র এবং অবিচ্ছেদ্য এজেন্ডা হয়ে থাকবে।
৪. কাতার (সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ১-৩) আয়াতের অর্থ: নিশ্চয় আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যেন আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন আর আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আল্লাহ আপনাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন।
কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বড় বড় পরাশক্তির মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। এই আয়াতের মাধ্যমে কাতারকে তাদের এই স্বাধীন, সাহসী এবং সফল কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য এক ধরণের ভূরাজনৈতিক সাধুবাদ ও ‘বিজয়’-এর শুভেচ্ছা জানিয়েছে ইরান।
৫. পাকিস্তান (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮০) আয়াতের অর্থ: বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি।
পাকিস্তান সবসময় মুসলিম বিশ্বের সংকটগুলোতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করে। এই দোয়ার মাধ্যমে ইরান প্রকারান্তরে পাকিস্তানকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংকট উত্তরণে একটি ‘সাহায্যকারী শক্তি’ হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
৬. তুরস্ক (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৫) আয়াতের অর্থ: মু’মিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
তুরস্ক মুখে ফিলিস্তিন বা মুসলিম উম্মাহর পক্ষে অনেক বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে ইসরাইল বা পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক বা শক্ত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয় না। এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান তুরস্কের সেই ‘ঘরে বসে থাকা’ বা নিষ্ক্রিয় নীতিকে ইঙ্গিত করে এক ধরণের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভর্ৎসনা করেছে।
৭. রাশিয়া (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২৩) আয়াতের অর্থ: মু’মিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের ওয়াদা বা অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে (অর্থাৎ তা রক্ষা করেছে)। অতঃপর তাদের কেউ কেউ নিজের মানত পূর্ণ করেছে (শহীদ হয়েছে) এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি।
বিপদকালীন বন্ধু বা সংকটে যাকে পাশে পেয়েছিল, সেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিনিধি দলের জন্য ছিল এই আয়াত। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়া ও ইরান দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কৌশলগত মিত্র।
ইরান যখন মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলায় খামেনির মৃত্যুর পর চরম সংকটে পড়ে, তখনো রাশিয়া তাদের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সমর্থন বজায় রেখেছে। পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর এত চাপ সত্ত্বেও রাশিয়া যেভাবে ইরানের সাথে দেওয়া সামরিক ও কূটনৈতিক "ওয়াদা বা অঙ্গীকার" ধরে রেখেছে, এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান প্রকারান্তরে রাশিয়াকে ঠিক সেই বিশ্বস্ত এবং অটল বন্ধুত্বেরই এক অনন্য সার্টিফিকেট দিয়েছে।
৮. সৌদি আরব (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৩) আয়াতের অর্থ: তোমাদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে সেই দু’দল সৈন্যের মধ্যে যারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দীরূপে দাঁড়িয়েছিল (বদর প্রান্তরে)। একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছিল এবং অপরদল ছিল কাফির, কাফিররা মুসলিমদেরকে প্রকাশ্য চোখে দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে স্বীয় সাহায্যের দ্বারা শক্তিশালী করে থাকেন, নিশ্চয়ই এতে দৃষ্টিমানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।
সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল খেরেজির নেতৃত্বে আসা পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল যখন হলরুমে প্রবেশ করে, ঠিক তখনই এই আয়াতটি উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করা হয়। বাস্তবে সাম্প্রতিক সময়ে যখন আম্রিকা ও ইরান পরস্পর যুদ্ধ করছিল, মজলুমের পাশে না দাঁড়িয়ে বরং নীরব থাকা, কিংবা ওই কাফের সৈন্যদলকেই সহযোগিতা করা সৌদি শাসকদের ভূমিকাকে এরচেয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরা আর সম্ভব ছিল না। ভরা মজলিশে সবার সামনে বসে নিজেদের ভণ্ডামির এমন খোলাখুলি সমালোচনা মুখ বুজে হজম করা ছাড়া সৌদিদের আর কোনো উপায় ছিল না।
৯. ভারত (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৭৩) আয়াতের অর্থ: এদেরকে লোকে বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো; কিন্তু এটা তাদের ঈমান আরও দৃঢ়তর করেছিল আর তারা বলেছিল, ‘আল্লাহ্ই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক!
বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বা নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ভারত ইরানের সাথে একটি স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে (যেমন চাবাহার বন্দর চুক্তি)। এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান ভারতকে বোঝাতে চেয়েছে যে, বাইরের কোনো শক্তির হুমকিতে কান না দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকাই প্রকৃত সাহসিকতা।