বৃষ্টির দাপট এড়িয়ে প্রকৃতির কোলে শান্তি খুঁজতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন এমন কিছু স্থান, যেখানে ঘুরে আসলে কেটে যেতে পারে আপনার কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কিংবা মানসিক অবসাদ। তাই মন চাইলে জুলাইয়ের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়াকে বিদায় জানিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ভারতের এই ছয়টি পর্যটনকেন্দ্রে, যেখানে নেই কোনো বৃষ্টির সম্ভাবনা।
বর্ষার অবিরাম বর্ষণ আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া যখন একঘেয়েমি নিয়ে আসে, তখন মন চায় এমন কোথাও হারিয়ে যেতে যেখানে আকাশ থাকবে মেঘমুক্ত আর প্রকৃতি থাকবে শান্ত। পাশের দেশ ভারতেই আছে এমন কিছু দারুণ জায়গা, যেখানে বর্ষার কোনো দাপট নেই বললেই চলে।
আপনার দীর্ঘ কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি আর মানসিক অবসাদ দূর করতে মন চাইলে এখনই ঘুরে আসতে পারেন ভারতের এই ৬টি অনন্য পর্যটনকেন্দ্রে, যেখানে নেই কোনো বৃষ্টির সম্ভাবনা।
১. লেহ-লাদাখ (লাদাখ)
লেহ-লাদাখ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে হিমালয় ও কারাকোরাম পর্বতমালার মাঝে অবস্থিত স্থান। এই অঞ্চলটি তার রুক্ষ পাহাড়, সুদৃশ্য উপত্যকা, প্রাচীন মঠ এবং মনোমুগ্ধকর হ্রদের জন্য সারা বিশ্বের দুঃসাহসী পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বৃষ্টির ছায়া অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় লাদাখে বর্ষার প্রকোপ প্রায় নেই বললেই চলে। এই সময়ে এখানকার আকাশ থাকে কাচের মতো পরিষ্কার।
কীভাবে যাবেন
প্রথমে বিমানে ঢাকা থেকে দিল্লী বা কলকাতা গিয়ে সরাসরি লেহ বিমানবন্দরে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে পরবর্তীতে সড়কপথে মানালি বা শ্রীনগর হয়ে রোমাঞ্চকর সফরে যাওয়া সম্ভব।
কোথায় থাকবেন
লেহ শহরে আধুনিক হোটেল, স্থানীয় হোমস্টে ও গাইড ক্যাম্পের সুব্যবস্থা রয়েছে।
দর্শনীয় স্থান: নীল জলের প্যাংগং হ্রদ, অপরূপ নুব্রা ভ্যালি, রহস্যময় ম্যাগনেটিক হিল এবং প্রাচীন বৌদ্ধ মনাস্ট্রি।
২. স্পিতি ভ্যালি (হিমাচল প্রদেশ)
ভারতের হিমাচল প্রদেশের লাহুল ও স্পিতি জেলায় অবস্থিত 'স্পিতি ভ্যালি'। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি হিমালয় সংলগ্ন তুষার মরুভূমি। তিব্বতি সংস্কৃতির ছোঁয়া এবং রুক্ষ পাহাড়ের রোমাঞ্চকর পরিবেশের জন্য একে 'লিটল তিব্বত' বলা হয়। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো কাজা শহর এবং প্রাচীন মঠগুলো। এছাড়া চারপাশের রুক্ষ পাহাড় আর শান্ত তিব্বতি সংস্কৃতির ছোঁয়া মন ভরিয়ে দেয়।
কীভাবে যাবেন
আপনাকে প্রথমে ঢাকা থেকে ভারতের দিল্লি বা চণ্ডীগড় পৌঁছাতে হবে, এবং সেখান থেকে সড়কপথে দুর্গম পথ পেরিয়ে স্পিতি ভ্যালির মূল কেন্দ্র কাজা তে যেতে হবে।
কোথায় থাকবেন
স্পিতি ভ্যালিতে থাকার জন্য প্রধানত তিন ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে: হোটেল, হোমস্টে এবং হোস্টেল। এখানে আধুনিক লাক্সারি হোটেল খুব কম, তবে তিব্বতি সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা নিতে হোমস্টে সবচেয়ে সেরা মাধ্যম।
দর্শনীয় স্থান: পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত স্পিতি ভ্যালিতে ঘোরার মতো বেশ কিছু বিস্ময়কর স্থান রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
কাজা : স্পিতি ভ্যালির প্রধান শহর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখান থেকেই সমস্ত ঘোরার পরিকল্পনা করা হয়।
হিক্কিম ও কোমিক : হিক্কিম গ্রামে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পোস্ট অফিস, এবং কোমিক হলো বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মোটরযোগ্য গ্রাম।
কি মনাস্ট্রি : হাজার বছরের পুরোনো, প্রাচীনতম ও বৃহত্তম বৌদ্ধ মঠ।
চিচাম ব্রিজ : এশিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ ঝুলন্ত সেতু। তাবো মনাস্ট্রি : ৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মঠকে হিমালয়ের অজন্তা বলা হয়।
৩. তাওয়াং (অরুণাচল প্রদেশ)
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত তাওয়াং অরুণাচল প্রদেশের এক অনন্য পাহাড়ি শহর। এটি তুষারাবৃত পর্বত, হ্রদ এবং সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মঠ ও বুমলা পাস (ভারত-চীন সীমান্ত) দেখার জন্য প্রতি বছর বহু পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। এছাড়া জুলাই মাসের কয়েক সপ্তাহ প্রায় বৃষ্টিহীন থাকে। তখন এখানকার সবুজ প্রকৃতি এই সময়ে এক মায়াবী রূপ ধারণ করে।
কীভাবে যাবেন
আকাশ পথে ঢাকা থেকে তাওয়াং যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঢাকা-গুয়াহাটি-তাওয়াং রুট ব্যবহার করা। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য তাওয়াং ভ্রমণে ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশের জন্য অতিরিক্ত একটি বিশেষ অনুমতিপত্র বা প্রটেক্টেড এরিয়া পারমিট প্রয়োজন হয়। গুয়াহাটি বা তেজপুর থেকে গাড়ি নিয়ে মেঘে ঢাকা সেলা পাস হয়ে তাওয়াং পৌঁছানো যায়।
কোথায় থাকবেন
তাওয়াং শহরে থাকার জন্য বাজেট হোমস্টে থেকে শুরু করে বিলাসবহুল হোটেল ও রিসোর্টের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া, বহু সরকারি কটেজ ও বেসরকারি লজ রয়েছে। তাই যাওয়ার আগেই থাকার জায়গা বুক করে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে
দর্শনীয় স্থান
তাওয়াং ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণগুলো হলো-
তাওয়াং মঠ: ১৬৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মঠটি ভারতের বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৌদ্ধ মঠ।
সে-লা পাস: ১৩,৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি শ্বাসরুদ্ধকর পাহাড়ি গিরিপথ, যা বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে।
মাধুরী লেক: সাংগাসার লেক নামেও পরিচিত, যা চারপাশের বরফাবৃত পাহাড় ও উপত্যকার জন্য অত্যন্ত সুন্দর।
বুমলা পাস: তাওয়াং শহর থেকে প্রায় ৩৭ কিমি দূরে ভারত-চীন সীমান্তে অবস্থিত।
জং জলপ্রপাত: পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বিশাল ও মনোরম জলপ্রপাত।
জসবন্তগড়: ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের বীর শহীদ জসবন্ত সিং রাওয়াতের স্মৃতিতে নির্মিত একটি ওয়ার মেমোরিয়াল।
৪. লাহাউল ভ্যালি
হিমাচল প্রদেশের লাহাউল উপত্যকা তার রুক্ষ পাহাড়, প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ এবং প্রাকৃতিক হ্রদের জন্য বিখ্যাত একটি অফবিট পর্যটন কেন্দ্র। অটল টানেল পার হলেই দেখা মেলে এই অনন্য উপত্যকার। বর্ষার দিনেও এখানকার আবহাওয়া থাকে মনোরম ও শুষ্ক।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে হিমাচল প্রদেশের লাহাউল ভ্যালি যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় উপায় হলো আকাশপথ এবং সড়কপথের সংমিশ্রণ। তার জন্য প্রথমে যেতে হবে দিল্লী বা কলকাতায়। তারপর মানালি থেকে রোটাং বা অটল টানেল হয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার গাড়ি দূরত্বে এই উপত্যকা।
কোথায় থাকবেন
লাহাউল ভ্যালিতে থাকার জন্য প্রধানত তিনটি অঞ্চলে চমৎকার হোটেল, হোমস্টে এবং লাক্সারি ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে: সিসু, কেলং এবং জিসপা। আপনার বাজেট এবং পছন্দের পরিবেশ অনুযায়ী এই জায়গাগুলো থেকে থাকার স্থান নির্বাচন করতে পারেন।
দর্শনীয় স্থান
পাহাড়ি কিয়লং শহর, সিসু জলপ্রপাত এবং মনোমুগ্ধকর পার্বত্য উপত্যকা।
এ অঞ্চলের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হলো
সিসু : অটল টানেল পার হওয়ার পরই এই সুন্দর উপত্যকাটি অবস্থিত। এখানকার সিসু জলপ্রপাত এবং সিসু লেক অত্যন্ত জনপ্রিয়।
কেলং: লাহাউল জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানে কার্দাং (Kardang) ও শশুর (Shashur) মঠ দেখার মতো।
জিসপা : চন্দ্রভাগা নদীর তীরে অবস্থিত একটি শান্ত ও মনোরম পাহাড়ি গ্রাম।
সূর্যাস্ত ও হ্রদ: সুরাজ তাল এবং দীপক তালের মতো আকর্ষণীয় লেক, যা বরফে ঘেরা পাহাড়ে ঘেরা।
বারালাচা লা : সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৮৯০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত একটি বিখ্যাত পাহাড়ি গিরিপথ
৫. কিন্নর (হিমাচল প্রদেশ)
কিন্নর হিমাচল প্রদেশের একটি অপূর্ব ও মনোমুগ্ধকর পাহাড়ি জেলা। এটি শিমলা থেকে প্রায় ২৩৫-২৬০ কিমি দূরে অবস্থিত এবং তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত। আপেল বাগান, বরফাবৃত কিন্নর কৈলাশ পর্বত, এবং প্রাচীন সংস্কৃতির জন্য এটি পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়িতে ঘেরা কিন্নর বর্ষার হাত থেকে বাঁচার আদর্শ জায়গা।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে কিন্নর (হিমাচল প্রদেশ) যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রথমে বিমানে যোগে দিল্লি বা চণ্ডীগড় পৌঁছানো এবং তারপর সেখান থেকে সড়কপথে কিন্নর যাত্রা করা। কিন্নরে সরাসরি কোনো বিমানবন্দর বা রেলওয়ে স্টেশন নেই, তাই ভ্রমণের শেষ অংশটি আপনাকে পাহাড়ি রাস্তা দিয়েই সম্পন্ন করতে হবে।
কোথায় থাকবেন
কিন্নর (হিমাচল প্রদেশ) ভ্রমণের সময় থাকার জন্য সরকারি ট্যুরিস্ট লজ, বিলাসবহুল রিসোর্ট, বাজেট হোটেল এবং স্থানীয় হোমস্টে-র চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্নর জেলাটি বেশ বড় হওয়ায় পর্যটকরা সাধারণত তাদের রুট অনুযায়ী মূলত কল্পা, সাংলা এবং চিতকুল—এই তিনটি প্রধান জায়গায় রাত্রিযাপন করে থাকেন।
দর্শনীয় স্থান
কিন্নরের বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:
কল্পা : সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯,৭১১ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই ছোট শহরটি কিন্নর কৈলাশ পর্বতের অসাধারণ দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। এখানকার আপেল বাগান এবং শতাব্দী প্রাচীন কাঠের মন্দির দেখার মতো।
সাংলা ভ্যালি : বাসপা উপত্যকায় অবস্থিত এই স্থানটিকে হিমাচলের অন্যতম সুন্দর উপত্যকা বলা হয়। এখানকার সবুজ তৃণভূমি, আপেল বাগান এবং নদী পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
রকং পেও : এটি কিন্নর জেলার সদর দপ্তর। এখান থেকে কিন্নর কৈলাশ শিবলিঙ্গের প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়।
চিতকুল : এটি বাসপা উপত্যকার শেষ ভারতীয় গ্রাম, যা এর দারুণ প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং তুষারাবৃত চূড়ার জন্য বিখ্যাত।
নাসারিং ও নিচার : এই জায়গাগুলো ঘন পাইন ও দেওদার বনে ঘেরা এবং বিরল তুষার চিতা (স্নো লেপার্ড) ও কালো ভালুকের আবাসস্থল।
ভাওয়া উপত্যকা : ট্রেকিং প্রেমীদের জন্য এটি একটি স্বর্গরাজ্য, যা কুল্লু ও স্পিতি উপত্যকার সঙ্গে যুক্ত।