প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যে প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্ম
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী কয়েক বছরের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে এবং জিয়াউর রহমান দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠা। দলটির ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি নিজেকে একটি বৃহৎ জনভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে তারেক রহমানও বিএনপির প্রতিষ্ঠাকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই সময়কে মূল্যায়ন করতে গেলে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপট, সামরিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশ- সবগুলো বিষয়কেই একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।
ক্ষমতার রাজনীতিতে বিএনপির উত্থান
প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও দলটি টিকে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ নেয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পায়।
বিএনপির সরকারগুলোর সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো, নারীশিক্ষা ও বেসরকারি খাত সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেওয়া উদ্যোগ দলটির রাজনৈতিক সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কও বিএনপির শাসনামলের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
ফলে বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসকে শুধু সাফল্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না; দলটির রাজনৈতিক অর্জনের পাশাপাশি বিতর্ক ও সমালোচনাও এই ইতিহাসের অংশ।
দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি ও আন্দোলন
২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়। ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে অবস্থান করে।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন, পরবর্তী সময়ে আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ—বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলে একাধিক পরিবর্তনের সাক্ষী এই সময়কাল।
পরবর্তীতে দলটি নির্বাচনব্যবস্থা, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চালায়। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংঘাত বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও কৌশল- দুটির ওপরই প্রভাব ফেলেছে।
খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্ব
বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পর তাঁর নেতৃত্বেই দলটি দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকে এবং একাধিকবার সরকার গঠন করে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে তারেক রহমান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, তিনি বিএনপিকে দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর তাঁর নেতৃত্বে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে- এমন অবস্থান প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতেও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু অতীতের রাজনৈতিক অর্জন স্মরণের উপলক্ষ নয়, বরং দলের নতুন নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অগ্রাধিকারেরও একটি বার্তা বহন করছে।
নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতির পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া যেকোনো দলের জন্যই বড় পরীক্ষা। বিএনপির ক্ষেত্রেও সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ- সুশাসন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনীতিকে গতিশীল করা, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে তারেক রহমান জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই এখন বিএনপির রাজনৈতিক সাফল্য মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
৪৮ বছরে বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলায় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- প্রতিষ্ঠার সময়কার জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ বিরোধী আন্দোলন।
দলটির সমর্থকদের কাছে বিএনপি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে দলটির ইতিহাসের মূল্যায়নে ক্ষমতার রাজনীতি, রাজনৈতিক সংঘাত ও শাসনামলের বিতর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের মধ্যেই বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরি হয়েছে। এখন নতুন নেতৃত্বে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা কতটা কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার উদাহরণ তৈরি করতে পারে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, পোস্টার প্রকাশ, বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচি।
তবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে বিএনপির জন্য এখন মূল বিষয় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার উদযাপন নয়, বরং সেই উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণ করা। ৪৮ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নতুন বাংলাদেশে কতটা কার্যকর শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে কাজে লাগে- সেটিই শেষ পর্যন্ত দলটির বর্তমান অধ্যায়ের সাফল্য নির্ধারণ করবে।