বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

মতামত

বিদ্যুৎ খাতের বিশৃঙ্খলা ও তীব্র লোডশেডিং: অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের খেসারত

বিদ্যুৎ খাতের বিশৃঙ্খলা ও তীব্র লোডশেডিং: অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের খেসারত

বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারকে চরম বিড়ম্বনায় ফেলেছে। এর পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা সাধারণের ধারণার বাইরে।

অভিজ্ঞরা মনে করছেন আন্তবর্তী কালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস ও তার জ্বালানি উপদেষ্টা ফয়জুলের ভুলই বর্তমান সংকটের সূতিকাগার। এনিয়েই সূচিত হয়েছে এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

বিদ্যুৎ সংকট বিগত ১৫ বছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে জ্বালানি খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের গৃহীত একাধিক বিতর্কিত ও স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ খাত গভীর সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

​বাতিলকৃত প্রকল্প ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার ২০১০ সালের 'বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন' (দায়মুক্তি আইন)-এর অধ্যাদেশ বাতিল করার ঘোষণা দেয়। তবে বাস্তবে পূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বহাল রেখে কেবল পাইপলাইনে থাকা সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়। 

৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এসব প্রকল্প বাতিলের পেছনে নীতিগত দ্বৈততার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও 'সভরেন গ্যারান্টি' বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা না থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো আগ্রহ দেখায়নি। মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের জন্য আবেদন জমা পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ।

​বকেয়া ঋণের বিশাল বোঝা: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের মেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ না করে বাকিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ের নীতি অনুসরণ করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোরই পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় নতুন সরকার চরম আর্থিক চাপে পড়েছে। কয়লা ও গ্যাসের বকেয়া না মেটানোর কারণে বর্তমানে একাধিক প্রধান কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

​বিতর্কিত এলএনজি চুক্তি ও রামপাল প্রকল্প

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশগ্রহণকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে অন্ধকারে রেখে এবং উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সম্পাদিত এই চুক্তিকে বিশেষজ্ঞরা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল বা পুনর্বিবেচনার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ড. ইউনূসের সরকার।

​বিদ্যুৎ খাত এখন ‘আইসিইউতে’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে মন্তব্য করেন, "পূর্বের সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাত নড়বড়ে অবস্থায় থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনা এটিকে মূলত আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে।" তিনি জানান, সংকট উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের বাতিল করা ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পুনর্বহালের উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়।

​বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বকেয়া বিল জমিয়ে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের ফলেই আজকের এই চরম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এটি বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে জনরোষের মুখোমুখি করার জন্য কোনো পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

##

আরও

ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তের দাবি জোরালো

মতামত

ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তের দাবি জোরালো

একটি সরকারের পতন বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অ...

২০২৬-০৯-০৩ ১৭:২২

পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ, কী হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক?

মতামত

পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ, কী হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক?

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতু...

২০২৬-০৮-২৭ ১৪:৪৯

রিফাইনারির অনুমতি পেতে আগের নাকচের তথ্য গোপন? তদন্তে বিপিসি

মতামত

রিফাইনারির অনুমতি পেতে আগের নাকচের তথ্য গোপন? তদন্তে বিপিসি

সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি পরিচালনার অনুমতি চেয়ে করা আগের আবেদন নাকচ হওয়ার তথ্য গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে আ...

২০২৬-০৮-২৬ ১৯:০৪

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের জোটে বাংলাদেশ: সামনে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা

মতামত

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের জোটে বাংলাদেশ: সামনে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা

মক্কা প্যাক্ট এখন বার্নিং ইস্যু হিসেবে সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। হঠাৎ তিনটি দেশ একটি সামরিক জোটে এক হলো কেন এ নিয়ে...

২০২৬-০৮-২৬ ১৯:০২

ব্যক্তির বক্তব্য নয়, পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক

মতামত

ব্যক্তির বক্তব্য নয়, পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক

পররাষ্ট্রনীতিতে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং আবেগতাড়িত বক্তব্য দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একজন রাজনীতিক তাঁর অবস্থান স্...

২০২৬-০৮-২৫ ১৮:৪৮