তবে নানা অর্থনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জের কারণে দেশের আবাসন খাত বর্তমানে নানা ঝুঁকির মুখে। অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে এ খাতকে সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য সহযোগী শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
‘আবাসন খাত বাঁচলে বাঁচবে দেশের অন্যান্য শিল্প’—এই বক্তব্যকে সামনে রেখে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাত কেবল ভবন ও ফ্ল্যাট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের গতিশীলতা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
সম্প্রতি আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর বহুমাত্রিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদনমুখী শিল্পের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আবাসন খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ খাতের স্থবিরতা কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সহযোগী শিল্পের ওপর আবাসন খাতের প্রভাব
রিয়েল এস্টেট খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক সহযোগী ও উপশিল্প। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এ সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এসব শিল্পের মধ্যে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও স্যানিটারি পণ্য উৎপাদন এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।
নির্মাণসামগ্রী শিল্প: রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর, বালু ও টাইলসের মতো নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন ও বিপণন আবাসন খাতের চাহিদার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
সাজসজ্জা ও ফিনিশিং শিল্প: রং, গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম এবং বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ সজ্জাসামগ্রীর বাজারও আবাসন নির্মাণের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
ইলেকট্রিক্যাল ও স্যানিটারি শিল্প: বৈদ্যুতিক তার, সুইচ-সকেট, লাইটিং সরঞ্জাম, পাইপ এবং স্যানিটারি ফিটিংসের উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রেও আবাসন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাতে মন্দা দেখা দিলে কিংবা ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমে গেলে তার প্রভাব দ্রুত সহযোগী শিল্পগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা হ্রাস পায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক শিল্পোৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে অবদান
দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নির্মাণ ও আবাসন খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের পাশাপাশি রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, পরিবহনকর্মী এবং অসংখ্য সাধারণ শ্রমিকের জীবিকা এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।
এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন, আর্থিক সেবা ও অভ্যন্তরীণ সজ্জাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিলে শুধু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত বিস্তৃত শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন খাতের বিনিয়োগ ও নির্মাণ কার্যক্রম সচল রাখা গেলে কর্মসংস্থান রক্ষা, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। এ কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে খাতটির অবদান বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সংকট উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
১. দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন: আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মকানুনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
২. সহজ শর্তে গৃহঋণ ও অর্থায়ন সুবিধা: ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সহজ শর্তে এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী সুদে গৃহঋণের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি ডেভেলপারদের জন্যও কার্যকর অর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে নির্মাণ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। এতে আবাসনের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা মিলতে পারে।
৩. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার: সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা, পরিকল্পিত নগরায়ণ ত্বরান্বিত করা এবং অবকাঠামোগত সুবিধা সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি (PPP) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি খাতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব।
৪. নির্মাণসামগ্রীর বাজারে স্থিতিশীলতা: রড, সিমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি আবাসন নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাব পড়ে ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য ও সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার ওপর। তাই বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন।
৫. অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা: ভূমি ব্যবহার, ভবনের নকশা অনুমোদন এবং নির্মাণসংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা কমানো গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে। তবে এসব উদ্যোগের সঙ্গে ভবনের নিরাপত্তা, নির্মাণমান ও প্রযোজ্য বিধিবিধানের কঠোর অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
টেকসই আবাসন খাতই পারে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আবাসন খাতের বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা সময়োপযোগী, সমন্বিত ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী আবাসনের অধিকার, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নির্মাণের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আবাসন খাতের উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন বা ফ্ল্যাট নির্মাণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম, পরিবহন, আর্থিক সেবা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ বাজারের সম্প্রসারণ। তাই এ খাতকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারলে তার ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, আবাসন খাতকে সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর নীতিসহায়তা, সাশ্রয়ী অর্থায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, আবাসন খাতের সুস্থ বিকাশ শুধু একটি শিল্পের অগ্রগতি নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।