প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর (এফসিডিও) বিদেশি সহায়তার বাজেট কমানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এর ফলে দেশটির বৈদেশিক সহায়তার বাজেট মোট জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন পরিচালিত বাংলাদেশি প্রকল্পেও। ২০২৩ সালে সুন্দরবন এলাকায় শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। প্রকল্পের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, জলজ চাষের উপকরণ ও প্রযুক্তি এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতার জন্য আবহাওয়া তথ্যব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানান, চলতি বছরের এপ্রিলে সংস্থাটিকে জুনের মধ্যে প্রকল্প বন্ধ করার কথা জানানো হয়। পরে সংস্থাটির প্রচেষ্টায় সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘২০২৬ সাল পর্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের ২ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংস্থাটি এর চেয়ে অনেক কম অর্থ পেয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও অর্থায়ন কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
তামান্না রহমান বলেন, ‘আকস্মিক অর্থ কাটছাঁটের কারণে গত আড়াই বছরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থা ও সুনাম হুমকির মুখে পড়েছে। প্রকল্পের নেয়া উদ্যোগগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা করার সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে।’
সুন্দরবনসংলগ্ন মানুষের জন্য প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের আগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা বাড়ছে।
তামান্না রহমান বলেন, ‘প্রতি বছর আরও তীব্র ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং মাটি লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের সহায়তার চাহিদা বাড়লেও কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কমছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবন এলাকায় বসবাসকারী অনেক মানুষ মাছ, মধু ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। অনেকে কৃষিকাজও করেন। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও দারিদ্র্যের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষতও এখনও অনেক মানুষের জীবনে রয়ে গেছে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ধ্বংস হয়েছিল স্থানীয় অবকাঠামো এবং অনেক এলাকায় পরিবর্তন এসেছিল ভূপ্রকৃতিতেও।
প্রকল্পটির আওতায় ১৪০ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণও দেয়া হয়।
তামান্না রহমানের আশঙ্কা, প্রকল্পটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে এসব উদ্যোক্তা আবার শূন্য অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন। কারণ, তাদের বাজার সম্পর্কে এখনও সীমিত ধারণা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও মাত্র দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে সব কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়া অত্যন্ত কঠিন।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশকে দেয়া দ্বিপক্ষীয় সহায়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে দেয়া যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থেকে কমে ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে নামার কথা রয়েছে।
লেবার পার্টির এমপি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রকল্প স্বল্প নোটিশে দুই বছর আগে বন্ধ করে দিলে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।’
তার মতে, এতে ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দুর্বল ফল আসতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাজ্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বদ্বীপে অবস্থিত সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার। বিপন্ন বাঘ, নদীর ডলফিনসহ অসংখ্য প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল এই বন।
সুন্দরবনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে উর্বর জমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রকল্প বন্ধের ঘোষণার পর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনেকে হতাশ হয়ে পড়েছেন। প্রকল্পের বিভিন্ন উদ্যোগ যখন ফল দিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় নতুন অর্থায়ন খুঁজে প্রকল্পের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাও সহজ নয়। ফলে বিদেশি সহায়তা কমে গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।