সোমবার (২৯ জুন) বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিস্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রচারিত হলে তিস্তা নদীর দুই পাড়ের মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানান। সংসদ অধিবেশনে তিনি দেশের অর্থনীতি, কৃষি, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, শিক্ষা এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সারা বছর যেন কৃষকরা নিরবচ্ছিন্ন পানির সরবরাহ পান, সেজন্য সরকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরপরই তিস্তা প্রসঙ্গে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তিনি ঘোষণা করেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইনশাআল্লাহ এই সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সংসদ সদস্যসহ উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের পানি ও তিস্তা নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে, বর্তমান সরকার তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং এর স্থায়ী সমাধানে বদ্ধপরিকর। উত্তরাঞ্চলের পানির অধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমাদের সংসদ সদস্যরা, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের দুটি বড় উদ্বেগ হচ্ছে পদ্মা ও তিস্তা নদী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত পরিকল্পিত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। জাতীয় বাজেটে যেহেতু তিস্তা নিয়ে কোনো বরাদ্দ নেই, তাই দ্রুত পরিকল্পনা প্রস্তুত করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদী এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে রয়েছে। তিস্তা পাড়ের মানুষের দুঃখ–দুর্দশা লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে। খরা মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার এবং বর্ষায় দুই কূল প্লাবিত হওয়ার দৃশ্য আর দেখতে হবে না।
গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের বাসিন্দা মিজানুর রহমান, কাউনিয়া উপজেলার আসাদুজ্জামানসহ অনেকে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদী শত শত মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ ঘুচবে।
জানা গেছে, শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ থাকে ৮০০ থেকে এক হাজার কিউসেক। তখন তিস্তার চারপাশে দেখা যায় ধুধু বালুচর। পানির অভাবে তিস্তা নদীর আশপাশের এলাকায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। পানির অভাবে অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা সেচ প্রকল্পের।
ভারত তিস্তার উজানে গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে তিস্তা প্রকল্পে প্রতিবছরই পানির ঘাটতি দেখা দেয়। আবার বর্ষাকালে বিপদসীমা অতিক্রম করলে পানি প্রবাহ বেড়ে যায় চার লাখ কিউসেক পর্যন্ত। প্রবল পানির তোড়ে ব্যারেজ ও আশপাশের অঞ্চল ঝুঁকির মুখে পড়ে। তখন ডালিয়া ব্যারেজের ৪৪টি গেট রাতদিন খুলে রেখেও পানি সরানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে শুকনো ও বর্ষা—উভয় মৌসুমেই তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। শুকনো মৌসুমে ভারতের ওপর পানিনির্ভরতার কারণে তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলা—নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় পানির সংকট দেখা দেয়।
তিস্তা নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুকনো মৌসুমে আর পানির জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এছাড়া তিস্তা নদীকে ঘিরে প্রায় ১২০০ কিলোমিটারের বেশি খাল রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব খালে পানি ধরে রাখা গেলে সারা বছরই এই পানি ব্যবহার করা যাবে। নদীতে সারা বছর পানি থাকলে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। সেই সঙ্গে পাল্টে যাবে দেশের চেহারা।