বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ হচ্ছে যুদ্ধের মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য। গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বহু রণক্ষেত্রে লড়াই করেছিল। কিন্তু পরে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১-২০২১) ও ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী স্থল যুদ্ধের ফলে বিপুল সেনা হতাহত হয় এবং দেশে জনমত দ্রুত বদলে যায়। এই সব অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
এ কারণেই এখন যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ কৌশলের দিকে ঝুঁকছে। আধুনিক ড্রোন, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত সামরিক ড্রোন এমকিও-৯ রিপার কিংবা দূরপাল্লার টমাহুক ক্রজ মিসাইলের কথা উল্লেখ করা যায়। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্থল বাহিনী মোতায়েন না করেও শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো সম্ভব হয়।
তবে এই কৌশল নিয়ে বিতর্কও কম নয়। তবে এই কৌশল নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ডেভিড পেট্রিয়াস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে, কিন্তু শুধু আকাশ বা দূরপাল্লার হামলা দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, ‘কখনো কখনো মাটিতে উপস্থিতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।’
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন মিয়ারশেইমার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি স্থল যুদ্ধে জড়াতে বেশি অনীহা দেখায় কারণ আধুনিক যুদ্ধের খরচ এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক বেশি। তার মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এখন এমন কৌশল বেছে নেয় যেখানে নিজের ক্ষয়ক্ষতি কম রেখে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা যায়।
দূরনিয়ন্ত্রিত হামলা অনেক সময় দ্রুত সামরিক সাফল্য এনে দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশকের অভিযান শেষে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের ঘটনা উল্লেখ করা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও স্থল বাস্তবতায় স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অর্থনৈতিক ব্যয়। বড় আকারের স্থল অভিযান পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সামরিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনাকারীরা এখন তুলনামূলক কম ব্যয় ও কম ঝুঁকির কৌশল প্রয়োগ নিরাপদ মনে করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আধুনিক যুগে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর দূরনিয়ন্ত্রিত হামলা যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ দিলেও এটি সবসময় স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে না। তাই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে-দূর থেকে পরিচালিত যুদ্ধ কি সত্যিই স্থল যুদ্ধে অর্জিত রাজনৈতিক ফলাফলকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে?