যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের এই অবস্থান এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের। সিলেট অঞ্চলের বহু তরুণ তখন ব্রিটিশ জাহাজে নাবিক বা ‘লাস্কার’ হিসেবে কাজ করতেন। যুদ্ধ শেষে তাদের অনেকেই ব্রিটেনে থেকে যান। পরে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনে শ্রমিকের চাহিদা বাড়লে দেশটিতে বাংলাদেশিদের পাড়ি জমানোর গতি তীব্র হয়।
শুরুর দিকে এই প্রবাসীদের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। দিন-রাত কারখানায় কিংবা টেক্সটাইল মিলে হাড়ভাঙা খাটুনি এবং ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকা, এই ছিল বাস্তবতা। সেই কঠিন দিনগুলো পেরিয়ে আজ তারা একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন।
২০২১ সালের ব্রিটিশ আদমশুমারি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি বাস করেন, যার প্রায় অর্ধেকই থাকেন লন্ডনে। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশি। এই অঞ্চলে বাংলা শুধু ঘরের ভেতরের ভাষা নয়; এটি দোকানের সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রচারণাতেও সমানভাবে ব্যবহৃত হয়।

একসময় ব্রিক লেনের পরিচিতি ছিল কেবলই বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট ও কারি ব্যবসার মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম সেই চেনা ছক ভেঙে দিয়েছে। প্রথম প্রজন্ম যেখানে স্বল্প আয়ের শ্রমঘন পেশা দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের প্রবাসীরা আজ ব্রিটিশ মূলধারার চিকিৎসা, আইটি, ব্যাংকিং, উচ্চশিক্ষা, গণমাধ্যম ও আইন পেশায় নিজেদের শীর্ষ অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।
ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বাংলাদেশিদের প্রভাব এখন দৃশ্যমান। স্থানীয় কাউন্সিল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত বেড়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের প্রতিনিধিত্ব। ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচনেও প্রধান দলগুলো থেকে শতাধিক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও তারা রাখছেন বড় অবদান। উন্নয়ন সংস্থা অক্সফামের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্য থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠানো হয়, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে ও সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

বিদেশে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা এক দ্বৈত সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। তারা যেমন ফিশ অ্যান্ড চিপস পছন্দ করে, তেমনি ভালোবাসে মায়ের হাতের ঐতিহ্যবাহী খিচুড়ি। লন্ডনের মাটিতে প্রতিবছর সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও পহেলা বৈশাখ। সাপ্তাহিক বাংলা স্কুলগুলোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাতৃভাষার শিক্ষা।

অভিবাসী জীবনের নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্য পেরিয়ে প্রথম প্রজন্মের লক্ষ্য যেখানে ছিল কেবল টিকে থাকা, সেখানে তৃতীয় প্রজন্মের প্রবাসীরা আজ ব্রিটিশ সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। প্রবাসে গড়ে ওঠা এই ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’ আজ বাঙালি জাতির মেধা, পরিশ্রম ও যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার এক ‘অনন্য দলিল’।