সান্তোস থেকে বার্সেলোনা। ৮লিওনেল মেসিকে ভাবা হতো তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী—অন্তত ব্রাজিলের সমর্থকেরা তাই ভাবতেন। সেই খ্যাতিই তাঁকে নিয়ে আসে স্বয়ং মেসির ক্লাব বার্সেলোনায়। স্প্যানিশ টিকিটাকা ছন্দে মেসির প্রতিদ্বন্দ্বী তকমা পেছনে ফেলে নেইমার হয়ে ওঠেন ফুটবল জাদুকরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাঁদের সঙ্গে উরুগুয়ের তারকা লুইস সুয়ারেজ। লাতিন আমেরিকার তিন দেশ এসে থামল ক্যাম্প ন্যুতে—ইউরোপের মহারণ্যে লেখা হলো ছন্দ, গতি আর আক্রমণের নতুন ইতিহাস—এমএসএন; ফুটবল ইতিহাসেরই এক অনন্য ত্রয়ী। সেই সময়ে নেইমার যেন নিজের প্রতিভাকে আগুনে পুড়িয়ে আরও শাণিত করেছিলেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা—ট্রফির ঝলকানিতে ভরে উঠেছিল তাঁর আকাশ।
২০১৫ সালের সেই বার্লিন রাত—যেখানে নেইমারের হাসি ছিল বিজয়ের প্রতীক, আর তাঁর চোখে ছিল ভবিষ্যতের অসীম সম্ভাবনা। কিন্তু কখনও কখনও উজ্জ্বলতার সবচেয়ে বড় শত্রু হয় নিজের ছায়া। প্যারিস সেন্ট-জার্মেইতে (পিএসজি) তাঁর যাত্রা ছিল রেকর্ডভাঙা, কিন্তু সেই পথেই শুরু হয় হারিয়ে যাওয়ার গল্প। অর্থ, আলো, প্রত্যাশা—সবকিছু মিলে যেন তাঁকে গ্রাস করতে থাকে। বার্সেলোনার দলীয় সুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একাকী নায়ক—যেখানে আলো বেশি, কিন্তু উষ্ণতা কম। অবশ্য এর আগেই ভাগ্য যেন এক নির্মম চিঠি লিখে রেখেছিল।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৪—নিজের দেশের মাটিতে স্বপ্নের মঞ্চ। কিন্তু এক ট্যাকলের আঘাতে ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন। কলম্বিয়ার জুয়ান জুনিগার আঘাতে মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট পান নেইমার। আর তাতেই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, যেন ভেঙে পড়ে একটি সম্ভাব্য কিংবদন্তির পথচলা। সেই ইনজুরির পর আর কখনো পুরোপুরি আগের নেইমারকে দেখা যায়নি। তাঁর গতিতে যেন বাঁধা পড়ে, তাঁর সাহসে ঢুকে যায় অদৃশ্য ভয়।
এর সঙ্গে যোগ হয় মাঠের বাইরের গল্প। বিতর্ক, সম্পর্ক, নারী কেলেঙ্কারি—সংবাদ শিরোনামে বারবার উঠে আসতে থাকে তাঁর নাম। কখনো অভিযোগ, কখনো সম্পর্কের টানাপোড়েন মিলিয়ে ফুটবলের চেয়ে ব্যক্তিজীবনের আলোচনাই যেন বড় হয়ে ওঠে। যে মন একসময় শুধুই বলের পেছনে ছুটত, সেই মন ধীরে ধীরে বিভ্রান্তির জালে আটকে পড়ে।
সময় এগোয়, আর নেইমার পিছিয়ে পড়েন। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো আর আগের মতো আগ্রহ দেখায় না। সৌদির আল হিলালে গেলেও চোটের কারণে ক্লাবটি তাঁকে রাখতেও অনীহা দেখায়। চোট, অনিয়ম, ফর্মহীনতা—সব মিলিয়ে নেইমার হয়ে ওঠেন এক অনিশ্চিত বিনিয়োগ। শেষমেশ ফিরে আসতে হয় শৈশবের সেই ঠিকানায়—সান্তোসে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সবকিছু। কিন্তু এই ফেরা আর বিজয়ের নয়; এ যেন ক্লান্ত এক রাজপুত্রের আশ্রয় নেওয়া নিজের পুরোনো প্রাসাদে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ—ব্রাজিলের স্কোয়াডে নেই নেইমারের নাম। কার্যত তাঁকে ‘আনফিট’ সার্টিফিকেট দেখিয়ে লাল কার্ড প্রস্তুত করে রেখেছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। অপেক্ষা কেবল সময়ের, আর করুণ দীর্ঘশ্বাসের। যে ছেলেটি একসময় ব্রাজিলের আশা ছিল, আজ সে নিজেই এক হারিয়ে যাওয়া গল্প।
এখন সামনে কী? ফুটবল কি তাঁকে আরেকটি সুযোগ দেবে? নাকি সময়ের স্রোতে তিনি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবেন অতীতের কিংবদন্তিদের ভিড়ে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে আসে এক অসমাপ্ত উপাখ্যান। রাজ্য ছিল, রাজত্ব ছিল—অথচ পতনের গল্পে নেইমার আজ মুকুটহীন রাজপুত্র।