ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার মুসল্লি সেখানে পৌঁছালেও, সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর বাধায় তারা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে পুরনো শহরের দেয়ালের বাইরে, খোলা রাস্তায় ঈদের নামাজ আদায় করেন তারা—শীতল কংক্রিটের ওপর দাঁড়িয়ে, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে।
নীরব কুদস, স্তব্ধ এক পবিত্র প্রাঙ্গণ
ঈদের সকালে সাধারণত ‘লাব্বাইক’ আর ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুখর থাকে জেরুজালেম। কিন্তু এবার শহরটি যেন এক ভূতুড়ে নীরবতায় আচ্ছন্ন। টানা ২০ দিন ধরে, বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকের পবিত্র রাতগুলোসহ, আল-হারাম আল-শরিফ পুরোপুরি অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে।
যদিও এটি ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ফিলিস্তিনি জনগণ এবং বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় এটিকে ইসলাম ধর্মের প্রথম কিবলার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারের একটি কৌশল হিসেবেই দেখছে।
এই অবরোধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। যুক্তরাজ্য থেকে আগত বহু মুসলিম, যারা প্রতি বছর রমজানের শেষ দশকে জেরুজালেমে আসেন, এবার আটকা পড়েছেন হোটেলেই। ডোম অব দ্য রক চোখের সামনে দেখেও তারা প্রবেশ করতে পারছেন না—এ যেন ঈদের দিনে এক গভীর বেদনার প্রতীক।
যুদ্ধের অজুহাত, বদলে যাচ্ছে বাস্তবতা
ধর্মীয় নেতারা, বিশেষ করে শায়খ ইকরিমা সাবরি, মুসল্লিদের আহ্বান জানিয়েছেন—যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে হলেও নামাজ আদায় করতে। এ যেন এক ধরনের আত্মিক প্রতিবাদ।
এদিকে অরগেনাইজেশন অব ইসলামিক করপোরেশন (ওআইসি) এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক ও আইনি অবস্থার গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এই ‘অস্থায়ী’ বন্ধ হয়তো স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ইতোমধ্যে মসজিদের ভেতরে আধুনিক নজরদারি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা বসানোর খবরও সামনে এসেছে।
গাজা: ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ঈদ
জেরুজালেম যখন নীরব, গাজায় তখন ঈদ এসেছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। ডেইর আল-বালাহ কিংবা খান ইউনিসের তাঁবু শহরগুলোতে মানুষ খোলা আকাশের নিচে নামাজ আদায় করেছে—চারপাশে ভাঙা ঘরবাড়ি, হারানো স্বজনের কবর।
ঈদের তাকবির মাঝেমধ্যে থেমে গেছে ড্রোনের শব্দে, দূরের বিস্ফোরণে। তবুও, ক্ষুধা আর শোকের মাঝেও গাজার মানুষের দৃঢ়তা স্পষ্ট—শিশুরা শুকনো রুটির টুকরো ভাগ করে নিয়েছে মিষ্টির মতো করে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ—লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনের শরণার্থী শিবিরেও ঈদের আনন্দ যেন ম্লান। সেখানে উৎসবের চেয়ে প্রার্থনাই বেশি—মুক্তির জন্য, নিরাপত্তার জন্য।
বিশ্ব প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্ন
এই ঘটনার পর আরব লীগ জরুরি বৈঠক ডেকেছে। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। লন্ডন, নিউইয়র্ক, ইস্তাম্বুলসহ বিশ্বের বড় বড় শহরে সংহতির বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে।
দিন শেষে প্রশ্ন একটাই, আগামীকাল কি খুলবে আল-আকসার দরজা? নাকি মুসলিম বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে এক দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের সূচনা? এই ঈদ তাই আনন্দের নয়, এক গভীর বেদনার প্রতীক হয়ে রইল—একটি নীরব মসজিদ, আর অশ্রুসিক্ত এক উম্মাহর গল্প।