সত্তরের দশক এবং ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও জ্বালানি তেল নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। সোমবার ওই মন্তব্য করে আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ১৯৭৩ এবং ১৯৭৯ সালের তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর গ্যাস সংকটের যে পরিস্থিতি হয়েছিল এখন তার চেয়ে খারাপ পরিস্থিতি। বাংলাদেশে জ্বালানি চাহিদার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করে সরকার। ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ২০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৪০টির বেশি তেল-গ্যাসের রিফাইনারি বা টার্মিনাল ও ডিপোতে হামলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে জটিলতা বাড়ছে। অনেক দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম তামিম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, সরকারের কাজ এখন মধ্যপ্রাচ্য ভিন্ন অন্য সোর্স থেকে তেল সংগ্রহ বা কেনা। অন্যদিকে, জনগণের কাজ হচ্ছে কৃচ্ছ সাধন। এই মুহূর্তে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের জনগণ কৃচ্ছ সাধন না করলে দেশ মহাবিপাকে পড়বে। তিনি বলেন, এখন আতঙ্কিত বা মজুতদারির জন্য অনেকে বেশি বেশি করে তেল কিনছেন। কিন্তু এভাবে চললে এক সময় তো দেশে তেলও পাওয়া যাবে না। তখন দেশকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। তাই এই মুহূর্তে সরকারের চেয়ে বেশি দায়িত্ব জনগণের। তবে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকারকে তৎপর হতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও জনগণকে তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক বাজারে মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ঈদের আগে বিপিসি প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত ডিজেল কিনেছে ২১৪ ডলারে। সেই হিসাবে এখন প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য পড়ছে ১৭৫ টাকার বেশি। কিন্তু বিক্রি করা হচ্ছে ১০০ টাকায়। এই অবস্থায়ও সরকার তেলের দাম আপাতত বাড়াচ্ছে না।
জ্বালানি তেল এবং গ্যাস ক্ষেত্রে হামলা চালানোয় তেল এবং গ্যাসের দাম বাড়ছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি দেশ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মারাত্মক আর্থিক খেসারত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর অনুযায়ী ২৪ দিনে ইরানের খার্গ আইল্যাল্ড, কাতারের রাস রাফান এলএনজি টার্মিনাল, সৌদি আরবের রাস টানুরা রিফাইনারি, ইয়ানবু রিফাইনারি, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, আরব আমিরাতে হাবসান গ্যাস ক্ষেত্র ফুজাইরা অয়েল টার্মিনাল, কুয়েতের রিফাইনারি, ইরাকের আল বাসরা অয়েল টার্মিনাল, ইসরাইলের হাইফা রিফাইনারিতে হামলা হয়েছে। এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারির পর হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহণ হয়। দৈনিক ২ কোটি ব্যারেল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপ : জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের ব্যবহার কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের দেশেও ঈদের আগের মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিদ্যুৎ এবং তেলের সাশ্রয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এই সাশ্রয় নিয়ে জ্বালানি বিভাগ এখন কাজ করছে।
এনডিটিভির খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সপ্তাহে ৪ দিন কর্মদিবস নির্ধারণ এবং সরকারি দপ্তরে জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
শ্রীলংকায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতীব জরুরি নয় এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাশ’ সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ লিটার পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে।
ফিলিপাইনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ভ্রমণ সীমিত করা হয়। এমন কি টেলিভিশনের উপস্থাপকরা নিজ থেকে কোট খুলে খবর প্রচার করেছেন।
ভুটানে মজুতদারি রোধে জেরি ক্যানে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। মিয়ানমারে তীব্র সংকটে পেট্রোলপাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে ‘জোড়-বিজোড়’ রেশনিং পদ্ধতি চালু হয়েছে। ভিয়েতনামে যতটুকু সম্ভব প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং নাগরিকদের গণপরিবহণ ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। কম্বোডিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রোলপাম্প কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লাওসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং যাতায়াত কমাতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের নিয়ম চালু হয়েছে।