সিএনএন-এ প্রকাশিত আলেকজান্দ্রা স্কোরেস ও ক্রিস ইসিডোরের এক গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই যুদ্ধের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। একদিকে আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম, অন্যদিকে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিলের ফলে টিকিট প্রাপ্তিতে চরম ভোগান্তি— সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে আকাশপথের যাত্রীরা এক ভয়ংকর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
তেলের বাজারের অগ্নিমূল্য ও বিমান ভাড়ার সমীকরণ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলায় তেলের দাম বর্তমানে আকাশচুম্বী এবং দিন দিন এটি লাগামছাড়া হচ্ছে। ফলে বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এই বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভ্রমণকারীদের পকেটেই আঘাত করতে পারে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছানোয় এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিমানের মোট খরচের প্রায় ৩০ শতাংশই জ্বালানি খাত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যে হারে বাড়ছে, সাধারণ গাণিতিক হিসেব অনুযায়ী যাত্রীদের টিকিটের দামও প্রায় একই অনুপাতে দ্রুত বেড়ে যাওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্কট কিরবি গত সপ্তাহে সিএনবিসি-কে জানিয়েছেন, ভাড়ার ওপর এই প্রভাব সম্ভবত খুব দ্রুতই শুরু হবে। তেলের দাম বাড়ার কারণে বিমান সংস্থাগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেলের বাজার উত্তাল হয়ে ওঠে। গত বৃহস্পতিবার তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। গত চার বছরের মধ্যে এই প্রথম তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে পৌঁছাল। যদিও সপ্তাহের শেষ দিকে এটি সামান্য কমে ৯৯ ডলারে নেমে আসে।
ফ্লাইট বাতিল ও যাতায়াতে বিঘ্ন
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেলের দামেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে। বিমান চলাচল সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’ (Cirium)-এর তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এটি বিমান সংস্থাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সাবেক নির্বাহী রব ব্রিটন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, তেলের সরবরাহ এখন পর্যন্ত খুব বেশি বাধাগ্রস্ত না হলেও এর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তার মতে, ‘যদি জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তি থাকে, তবে বিমানের ভাড়াও নিশ্চিতভাবে বাড়বে।’ এটি বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই; সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানির দাম যে হারে বাড়বে, টিকিটের দামও প্রায় একই অনুপাতে বাড়তে পারে।
শ্রমিকদের বেতনের পর একটি বিমান সংস্থার দ্বিতীয় বৃহত্তম খরচ হলো জ্বালানি। ব্রিটন জানান, একটি এয়ারলাইন্সের মোট খরচের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশই ব্যয় হয় এই জেট ফুয়েলের পেছনে। আর এই খরচ পুরোটাই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে বিমান সংস্থাগুলো দেরি না করে খুব দ্রুত টিকিটের দাম বাড়িয়ে বাড়তি খরচের সমন্বয় করে থাকে।