এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী সংগঠন, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং ঋণগ্রস্ত স্নাতকদের সরাসরি মতামত ও অভিজ্ঞতা নেওয়া হচ্ছে। মূলত ঋণের সুদের হার, পরিশোধের নিয়ম এবং স্নাতকদের ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও মানসিক চাপকে কেন্দ্র করেই এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষার্থী ইউনিয়ন দাবি করেছে, বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক স্নাতক বছরের পর বছর নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করার পরেও উচ্চ সুদের হারের কারণে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ কমার পরিবর্তে উল্টো ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে তারা ঋণ পরিশোধের ন্যূনতম আয়সীমা এবং সুদের হার পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের জনসাধারণের একটি বড় অংশ এখন উচ্চশিক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনে যে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় এর প্রকৃত মূল্য বা প্রাপ্তি যথেষ্ট নয়। ২০০৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। একই সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া যায়— এমন সনাতন বিশ্বাসের জায়গায় মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই পুরো পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে 'প্ল্যান টু' ক্যাটাগরিতে স্টুডেন্ট লোন নেওয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার সময় জেমা নামের এক স্নাতকের ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৪,১০৫ পাউন্ড, যা বর্তমানে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের পরও সুদের কারণে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২,০০০ পাউন্ডে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, এই ঋণের চাপের কারণে তিনি এবং তার সঙ্গী সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
ইতিমধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি ভুক্তভোগী মানুষ সংসদীয় তদন্ত কমিটির কাছে তাদের লিখিত মতামত ও অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তাদের অনেকেরই সাধারণ অভিযোগ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় তারা স্টুডেন্ট লোনের প্রকৃত জটিল শর্তাবলী ও এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে একদমই পরিষ্কার কোনো ধারণা পাননি। বর্তমানে ইংল্যান্ডে স্নাতকদের নির্ধারিত সীমার ওপরে থাকা আয়ের ৯ শতাংশ অর্থ ঋণ পরিশোধের পেছনে ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে ২৯,৩৮৫ পাউন্ডের পরিশোধযোগ্য আয়সীমা পরবর্তী তিন বছরের জন্য স্থির রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সমালোচকদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই সিদ্ধান্তের ফলে আরো বেশি সাধারণ আয়ের মানুষ দ্রুত ঋণ পরিশোধের কঠোর বাধ্যবাধকতার আওতায় চলে আসবেন এবং তাদের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হবে।
অবশ্য সব ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা এখনো অত্যন্ত মূল্যবান বলে মন্তব্য করেছেন 'ইউনিভার্সিটিজ ইউকে'-এর প্রধান নির্বাহী ভিভিয়েন স্টার্ন। তিনি যুক্তি দেখান যে, স্নাতকদের ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা সাধারণদের চেয়ে বেশি থাকে, তাদের গড় আয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি হয় এবং তারা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পান। তবে তিনিও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান স্টুডেন্ট লোন ব্যবস্থাটিকে আরো বেশি স্বচ্ছ, আধুনিক ও ন্যায়সঙ্গত করা জরুরি। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারও বর্তমান ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, কম আয়ের স্নাতকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই মূলত আয়ভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর অবশিষ্টাংশ ঋণ মওকুফ করে দেওয়া হয়। এছাড়া সরকার ইতিমধ্যে ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ করেছে। তবে এই তদন্তের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, স্টুডেন্ট লোন এখন কেবল শিক্ষার খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি যুক্তরাজ্যের একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের বাড়ি কেনা বা পরিবার গঠনের মতো মৌলিক সিদ্ধান্তগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে।