রেড ডেভিলসদের (বেলজিয়াম দল) শুরুটা কিছুটা ধীরগতির ছিল। উত্তর মেসিডোনিয়ার সঙ্গে ড্র করার পর ওয়েলসের বিপক্ষে ৪-৩ ব্যবধানে তারা নাটকীয় জয় পায়। এই ম্যাচে তিন গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও বেলজিয়াম সেই লিড হাতছাড়া করেছিল, তবে শেষ মুহূর্তে কেভিন ডি ব্রুইনার করা গোলে তারা জয় নিশ্চিত করে। অবশ্য দ্রুতই তারা নিজেদের চেনা ছন্দ খুঁজে পায় এবং গ্রুপ পর্বের খেলা ৫টি জয় ও ৩টি ড্রয়ের মাধ্যমে শেষ করে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
বেলজিয়ামের ‘স্বর্ণযুগ’ (গোল্ডেন জেনারেশন) হয়তো তার শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে, তবে দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের জন্য সম্ভবত শেষ এই বিশ্বকাপে তারা আরও একটি শেষ বড় সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে। মিশর, ইরান এবং নিউজিল্যান্ডের সাথে গ্রুপ ‘জি’-তে থাকা বেলজিয়াম গ্রুপ সেরা হওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবেই ফেভারিট এবং তাদের ন্যূনতম লক্ষ্য হওয়া উচিত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো।
তবে পূর্ববর্তী আসরগুলোর মতো নয়, এবারের টুর্নামেন্টে দলটির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী খেলোয়াড়কে ঘিরে কিছু সংশয় ও প্রশ্ন রয়ে গেছে। রোমেলু লুকাকু এবং কেভিন ডি ব্রুইনা উভয়েই চলতি মরসুমে দীর্ঘস্থায়ী ইনজুরিতে ভুগেছেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থা বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ অভিযানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাছাড়া রক্ষণভাগেও তাদের সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে, কারণ ভিনসেন্ট কোম্পানি, টোবি অল্ডারওয়েইরেল্ড এবং ইয়ান ভের্টোনগেনের অবসরের পর থেকে দলের এই জায়গাটি প্রায়শই সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বেলজিয়ামের কোচ: রুডি গার্সিয়া
ডোমেনিকো টেডেসকোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে রুডি গার্সিয়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেলজিয়ামের প্রধান কোচ হন।
বিশ্বকাপের আগে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে তারকাখচিত একটি ড্রেসিংরুম সামলানো, যাদের মধ্যে অনেকেই এখন আর তাদের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে নেই। গার্সিয়া যদি অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন, তবে বেলজিয়ামের এই টুর্নামেন্টের অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গার্সিয়া এর আগে রোমা, নাপোলি, মার্সেই এবং আল-নাসরের মতো ক্লাবগুলো কোচিং করিয়েছেন। মূলত ৪-২-৩-১ ফর্মেশন ব্যবহার করেন, যা প্রয়োজনে ৪-৩-৩ ফর্মেশনেও রূপান্তর করা যায়। এই কৌশলগত ফর্মেশনটি তার দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের শক্তির সাথে বেশ মানানসই।
বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ সূচি
১৫ জুন: বেলজিয়াম বনাম মিশর - সিয়াটল স্টেডিয়াম
২১ জুন: বেলজিয়াম বনাম ইরান - লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
২৬ জুন: নিউজিল্যান্ড বনাম বেলজিয়াম - বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: উয়েফা
সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য: তৃতীয় স্থান
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০ (গ্রুপ পর্ব)
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ : ১৫ বার (১৯৩০, ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৭০, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)
টানা যোগ্যতা অর্জনের বর্তমান রেকর্ড: চার বার
সর্বমোট বিশ্বকাপ রেকর্ড : ম্যাচ খেলেছে ৫১, জয় ২১, ড্র ১০, হার ২০, গোল করেছে ৬৯, গোল খেয়েছে ৭৪
বেলজিয়ামের প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৩০ সালে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী আসরেই 'রেড ডেভিলস'রা বিশ্বমঞ্চে তাদের যাত্রা শুরু করে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩-০ ব্যবধানে এবং প্যারাগুয়ের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় বেলজিয়ানদের। কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় পৌঁছাতে না পারলেও, হেক্টর গোয়েটিঙ্কের শিষ্যরা অন্তত এতটুকু ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারতেন যে, তারা ছিলেন সেই টুর্নামেন্টের অগ্রপথিকদের অন্যতম, যারা পরবর্তী সময়ে বিশ্বমঞ্চে দেশটির নিয়মিত অংশগ্রহণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
বেলজিয়ামের সর্বশেষ বিশ্বকাপ
রবার্তো মার্টিনেজের শিষ্যরা ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে ভালো কিছুর আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত হতাশ করে, কারণ তারা গ্রুপ ‘এফ’-এর বাধা পার করতে ব্যর্থ হয়। বেলজিয়ানরা তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছিল কানাডার মতো এক সুযোগ নষ্ট করা দলের বিপেক্ষে ১-০ ব্যবধানের একটি নিষ্প্রাণ জয় দিয়ে। তবে, ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামা ইউরোপের এই দলটি দ্বিতীয় ম্যাচে সেই জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারেনি; মরক্কোর বিপক্ষে আরও একটি ধুঁকতে থাকা পারফরম্যান্সের কারণে তাদের ২-০ ব্যবধানে হারতে হয়।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে মার্টিনেজের ছন্দহীন দলটি কেবল একটি গোলশূন্য ড্রই করতে সক্ষম হয়। এই ফলাফলে বেলজিয়ামকে বিদায় করে ২০১৮ সালের রানার্স-আপরা পরবর্তী রাউন্ডে চলে যায়।

বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ গোলদাতা
দুই স্ট্রাইকার মার্ক উইলমোটস ও রোমেলু লুকাকু প্রত্যেকে ৫টি করে গোল করে বিশ্বকাপের মঞ্চে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে আছেন। সাবেক আক্রমণভাগের তারকা উইলমোটস টুর্নামেন্টের চারটি আসর জুড়ে মাত্র ৮টি ম্যাচ খেলেই তার এই গোলসংখ্যা স্পর্শ করেন। দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুকাকু ১২টি ম্যাচ খেলে ৫টি গোল করেছেন।
বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের পক্ষে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
মিডফিল্ড জাদুকর এনজো সিফোকে অন্যতম সেরা প্রতিভাবান বেলজিয়ান হিসেবে গণ্য করা হয়। মাঠের মাঝখান থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার মতো অসাধারণ ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতার অধিকারী সিফোর ছিল নিখুঁত টেকনিক ও চোখ ধাঁধানো দূরদৃষ্টি । মাত্র ১৮ বছর বয়সে এক তরুণ মুখ হিসেবে জাতীয় দলে অভিষেকের পর তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বকাপের ৪টি আসরে মোট ১৭টি ম্যাচ খেলেছেন।
বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বড় জয়
১৯৭০ সালে এল সালভাদরের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জিতেছিল বেলজিয়াম। তারপর ২০১৮ সালে একই স্কোরে পানামাকে হারায় তারা। একই আসরে তিন গোলের ব্যবধানে তারা জিতেছে তিউনিসিয়ার বিরুদ্ধে, সেই ম্যাচে ৫-২ গোলে জয় পায় বেলজিয়ানরা।
এক নজরে বেলজিয়ামের স্কোয়াড
গোলরক্ষক: থিবো কোর্তোয়া, সেনে ল্যামেন্স, মাইক পেন্ডার্স
ডিফেন্ডার: টিমোথি কাস্তানিয়ে, জেনো ডেবাস্ট, ম্যাক্সিম ডে কুইপার, কোনি ডে উইন্টার, ব্র্যান্ডন মেখেলে, থমাস মুনিয়ে, নাথান এনগয়, জোয়াকিন সেইস, আর্থার থিয়াতে
মিডফিল্ডার: কেভিন ডি ব্রুইনে, আমাদু ওনানা, নিকোলাস রাসকিন, ইউরি টিলেমান্স, হান্স ভানাকেন, অ্যাক্সেল উইটসেল
ফরোয়ার্ড: চার্লস ডে কেতেলায়েরে, জেরেমি ডোকু, মাতিয়াস ফার্নান্দেজ-পার্দো, রোমেলু লুকাকু, দোদি লুকেবাকিও, দিয়েগো মোরেইরা, আলেক্সিস সালেমেকার্স, লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড।