দিনমজুরের পরিবারে জন্ম নেওয়া গোলাম রব্বানীর শৈশব কেটেছে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তবুও পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারাননি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় গ্রামে কলেরার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক গভীর তাগিদ তৈরি হয় তার মধ্যে। সেই সময় স্যালাইন তৈরি শেখার মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানোর ছোট্ট চেষ্টা থেকেই তার মানবিকতার বীজ রোপিত হয়। সেখান থেকেই গ্রামের মানুষের কাছে ‘ডাক্তার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি—যদিও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না।
অভাবের কারণে এইচএসসি সম্পন্ন করতে না পারলেও থেমে যাননি গোলাম রব্বানী। পল্লী চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেন মানুষের সেবায়। পাশাপাশি সমাজসেবা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের অবস্থান। সততা, পরিশ্রম আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই তাকে পৌঁছে দেয় জনপ্রতিনিধির আসনে।
২০১১ সালে অল্প ভোটে পরাজয়ের পরও ভেঙে পড়েননি তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২১ সালে বিপুল ভোটে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিদিন নির্ধারিত সময় ইউনিয়ন পরিষদে বসে মানুষের সমস্যার সমাধান করা, আবার নিজের ওষুধের দোকানে গিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক নিরলস সেবক।
পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রেফতার হলে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে পুরো ইউনিয়নের দায়িত্ব পান তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি—জন্ম নিবন্ধন সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেন। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করে মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করেন। উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজেও তার সক্রিয় ভূমিকা স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। জীবনের অপূর্ণ স্বপ্ন—শিক্ষা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা—আবারও তাকে টেনে নিয়েছে বইয়ের কাছে। গত বছর নিজের মেয়ে রওনক জাহানের সঙ্গে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে তিনি নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দিনের বেলায় জনসেবা, আর ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা—এই কঠিন সমীকরণ সামলেও তিনি এগিয়ে চলেছেন অবিচলভাবে।
গোলাম রব্বানী আকন্দের এই গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি ইচ্ছাশক্তি, দায়িত্ববোধ ও স্বপ্নপূরণের এক জীবন্ত উদাহরণ। সমাজে যেখানে অনেকেই বয়স বা পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করান, সেখানে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—সত্যিকারের চাওয়া থাকলে পথ কখনো বন্ধ হয় না।