সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সংযম আনতে নির্দেশনা জারি করেছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসে এসি সীমিত ব্যবহারের নির্দেশ, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং যানবাহন কম ব্যবহার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনার জন্য আংশিক রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। যানবাহনভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে ‘প্যানিক বায়িং’ নিয়ন্ত্রণ এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানি, নতুন উৎস খোঁজা ও মজুত বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় শিল্পখাতে কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ছয়টি সার কারখানায় সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এলএনজি আমদানিও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় করা হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও পাচার রোধে প্রশাসনিক অভিযান চালানো হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে সরকার বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়াচ্ছে। সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও অন্যান্য উৎসের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অবৈধ মজুত রোধ না করলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, “সরকারের সব অর্গানকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা অবৈধ মজুত করছে, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটি বড় ক্রাইম এবং সংকট বাড়াচ্ছে।”
আন্তর্জাতিক উদাহরণ:
ভারত: ভারতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রান্নার গ্যাসের সংকট ও কালোবাজারি দেখা দিয়েছে। তবে সরকার জানিয়েছে, দেশে যথেষ্ট জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং ‘প্যানিক বাইং’ না করার আহ্বান জানিয়েছে।
সরবরাহ নিশ্চিত করতে এলপিজি বণ্টন নেটওয়ার্কে কড়া নজরদারি ও আড়াই হাজারের বেশি আকস্মিক পরিদর্শন চালানো হয়েছে। গৃহস্থালি, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এলপিজি চাপ কমাতে পাইপলাইন সংযোগযুক্ত গ্রাহকদের এলপিজি সংযোগ বাতিলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং কেরোসিন ও কয়লা সহজলভ্য করা হয়েছে।
পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর লিটার প্রতি ১০ টাকা শুল্ক কমানো হয়েছে, ডিজেলের রপ্তানি শুল্ক চালু করে অভ্যন্তরীণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চীন: চীন জ্বালানি সংকটে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করেছে। সংকটের আগে বিপুল তেল মজুত রাখা (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) এবং রপ্তানি সীমিত করে অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়েছে।
চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি রেশনিং না করলেও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। দেশীয় কয়লা, নবায়নযোগ্য শক্তি, পারমাণবিক শক্তি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো হচ্ছে।
শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, শক্তি-দক্ষ ইলেকট্রিক গাড়ি, সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কা জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’-এর মাধ্যমে যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট জ্বালানি বরাদ্দ করা হচ্ছে। সপ্তাহের বুধবার অতিরিক্ত ছুটি দিয়ে চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে, অনলাইন ক্লাস ও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাতায়াত কমানো হচ্ছে।
সরকার জ্বালানির দাম সমন্বয়, বিদ্যুতের ট্যারিফ সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের সহায়তায় ‘কস্ট-রিফ্লেকটিভ প্রাইসিং’ চালু করেছে। সরবরাহ বাড়াতে তেল, কয়লা ও গ্যাস আমদানি বৃদ্ধি ও রিফাইনারি সচল রাখা হচ্ছে। সরকারি খাতে জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা ও বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশটি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
ফিলিপাইন: ফিলিপাইনে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার দ্রুত জ্বালানি আমদানি, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারছে। একটি বিশেষ কমিটি জ্বালানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্যের বণ্টন তদারকি করছে।
সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়া, ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানি, মজুত বৃদ্ধি ও জরুরি তহবিল গঠন করা হয়েছে। চাহিদা কমাতে সরকারি অফিসে ব্যবহার সীমিত করা, চারদিনের কর্মসপ্তাহ, রিমোট কাজ ও এয়ার কন্ডিশনারে নিয়ন্ত্রণ চালু হয়েছে। জনগণকে গণপরিবহন ব্যবহার ও জ্বালানি সাশ্রয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব কমাতে পরিবহন ভর্তুকি, বিনামূল্যে বাসসেবা, জ্বালানি কর হ্রাস এবং মজুতদারি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎখাতে স্পট মার্কেট সাময়িক স্থগিত ও নির্ধারিত দামে সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এই পদক্ষেপগুলো মূলত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশও এই সংকট মোকাবিলায় ধারাবাহিক ও সমন্বিত নীতিমালা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখছে।