সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরগুলোতে দ্রুত পরিবর্তনশীল জনসংখ্যাগত প্রবণতা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। গত বছরের ১৫ আগস্ট লালকেল্লা থেকে দেয়া ভাষণে নরেন্দ্র মোদি দেশের কিছু অঞ্চলে ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এরপর থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা শুরু হয়।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, এটি শুধু জনসংখ্যার পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ভারসাম্য এবং প্রশাসনিক পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত। আর এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার জন্য গত ২৬ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
সূত্রগুলোর মতে, এই কমিটি ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ভারতের কয়েকটি নগর কেন্দ্রের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করবে। এক বছরের মধ্যে কমিটিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও সমবায়মন্ত্রী অমিত শাহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে কমিটির অগ্রগতি এবং তাদের কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে কমিটির জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। আগামী কয়েক মাসে কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। এরপর সরকারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।
জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বলতে কী বোঝায়?
জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বলতে কোনও অঞ্চলের জনসংখ্যার গঠন বা কাঠামোর পরিবর্তনকে বোঝায়। এ ধরনের পরিবর্তন জন্মহার, মৃত্যুহার, কর্মসংস্থানের সুযোগ, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো স্বাভাবিক কারণে ঘটতে পারে।
তবে মোদি সরকারের মূল নজর তথাকথিত ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’-এর ওপর। কারণ এটি অবৈধ অনুপ্রবেশ, নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক কারণে কোনও অঞ্চলের জনসংখ্যার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো, সম্পদ বণ্টন, প্রশাসন এবং নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কমিটি এসব উদ্বেগ খতিয়ে দেখবে এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে যেসব দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর পক্ষে বাস্তব তথ্য-প্রমাণ রয়েছে কি না তা মূল্যায়ন করবে।
ভারত সরকারের গঠিত কমিটির কাজের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকবে ভারত-বাংলাদেশ ও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী জেলাগুলো।
বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে এ বিষয়ে প্রায়ই বিতর্ক দেখা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, সরেজমিন পরিদর্শনের সময় কমিটি স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে।
এছাড়া পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য জনগণনা তথ্য, ভোটার তালিকা, অভিবাসন-সংক্রান্ত নথি এবং সরকারি বিভিন্ন ডেটাবেসও বিশ্লেষণ করা হবে।
অবশ্য কমিটির কার্যপরিধি শুধু সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বড় মহানগর ও শিল্পকেন্দ্রগুলোও এই গবেষণার আওতায় থাকবে। দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, নয়ডা, গুরুগ্রাম, আহমেদাবাদ এবং পুনের মতো শহরগুলোতে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসে।
এসব নগর কেন্দ্রে বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের অভিবাসনের ধরণও কমিটি পর্যালোচনা করতে পারে। সরকারি সূত্রের মতে, দ্রুত নগরায়ণ এবং নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, জনসেবা ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের জন্য এসব জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইন্ডিয়া টুডে বলছে, ভারত সরকার বিষয়টিকে কেবল জনসংখ্যা গবেষণার বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অতীতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাল পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকায় অননুমোদিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি এবং স্পর্শকাতর এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে বসতি গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, জনসংখ্যাগত বড় পরিবর্তনের কারণ চিহ্নিত করা এবং সময়মতো সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়া জাতীয় স্বার্থ ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য জরুরি।
উচ্চপর্যায়ের এই কমিটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করবে। এর মধ্যে রয়েছে— সীমান্ত জেলাগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা, সম্ভাব্য অবৈধ অভিবাসন ও অনুপ্রবেশের ঘটনা খতিয়ে দেখা, মহানগর ও শিল্পাঞ্চলে জনসংখ্যার বাড়তি চাপ খতিয়ে দেখা, স্থানীয় সম্পদ ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব খতিয়ে দেখাসহ ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক নীতির জন্য সুপারিশ প্রস্তাব করা।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, রাজ্য সরকার, নিরাপত্তা সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মতামতও সংগ্রহ করবে কমিটি।