তবে, যে কোনো হুমকি মোকাবিলায় এ ধরনের সুরক্ষিত ব্যবস্থাকেও ভেদ্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বাংকার ধ্বংসে তৈরি করেছে বাংকার বাস্টার নামে অত্যাধুনিক বোমা। এই বোমা ব্যবহারে সাফল্যও পেয়েছে তারা। গেল বছর মাটির অনেক গভীরে থাকা ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসপাহান পারমাণবিক স্থাপনায় সফল হামলা চালায় ওয়াশিংটন।
এবছর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে ওয়াশিংটন-তেল আবিবের আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করলেও স্থায়ী সমাধান কিংবা শুরু হওয়া যুদ্ধের সমাপ্তির পথ বের করতে পারেনি দেশ দু’টি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের নেতৃত্বকে নির্মূল করা। এরই অংশ হিসেবে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল; ব্যবহার করা হয় জিবিইউ লেজার-গাইডেড বাংকার বাস্টার বোমা। এতে নিহত হন খামেনি, তার স্ত্রী ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ ইরানে শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতৃত্ব।
শীর্ষ নেতার এই প্রস্থান ইরানিদের হৃদয়ে দাবানলের স্ফুলিঙ্গের মতো আঘাত হানে। খামেনির শূন্যতায় আগাম নির্দেশনা অনুযায়ী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সকল ইউনিটের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় সামরিক ক্ষমতা। ফলে, পাল্টা হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইরান। এমনকি তারা যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়েছে।
ফলে ইরানের পুরোপুরি নেতৃত্ব শূন্যতার যে স্বপ্ন লালিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে কিছু টার্গেট কিলিং চালালেও ইসরায়েল ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে তেহরানের পাল্টা হামলা থামাতে কিংবা বন্ধ করতে পারছে না।
ইরান আগে থেকেই বলে আসছে তাদের বহু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনসহ উন্নত সমরাস্ত্র অত্যন্ত সুরক্ষিত জায়গায় সংরক্ষিত। এসব সমরাস্ত্রকে টার্গেট করে বাংকার বাস্টার বোমা ব্যবহার করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে, ইরানের হামলা কোনো মতেই থামানো যাচ্ছে না।
সর্বশেষ ইরানের সাবেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. আলি লারিজানির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিব শহরে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, এতে হতাহত হয়েছে দুই শতাধিক ইসরায়েলি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাংকার বাস্টার বোমার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় দেখা যাচ্ছে। এছাড়া এও ধারণা করা হচ্ছে যে, ইরানের মিসাইল সিটি মাটির এতটাই গভীরে, যেখানে বাংকার বাস্টার বোমা পৌঁছাতে পারছে না।
ইরান তার অনেক অস্ত্র গভীর ভূগর্ভে সংরক্ষণ করছে এমন সন্দেহ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৫ হাজার পাউন্ড (প্রায় ২২৭০ কেজি) ওজনের বাংকার বাস্টার বোমা ব্যবহার করছে এই যুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের উপকূলবর্তী হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে ঠিক কোন ধরনের ভেদকারী বোমা ব্যবহার করা হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি।
তবে এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে দুটি পরিচিত বোমার কথা উঠে এসেছে। একটি হলো- জিবিইউ-২৮ লেজার নির্দেশিত বোমা এবং অপেক্ষাকৃত নতুন জিবিইউ-৭২ উন্নত ৫ হাজার পাউন্ডের পেনিট্রেটর। এর মধ্যে জিবিইউ-৭২ ব্যবহারের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২১ সালে প্রথম পরীক্ষা চালানো এই বোমাটি একটি বড় যৌথ সরাসরি আঘাতকারী নির্ভুল অস্ত্র, যা স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
বড় আকারের হলেও জিবিইউ-৭২ এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানে বহন করা সম্ভব, ফলে সামরিক পরিকল্পনাকারীরা শুধু বি-১বি বোমারু বিমানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সাধারণ যুদ্ধবিমানেও এটি মোতায়েন করতে পারেন।
ইরানে এর কার্যকারিতা নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনেও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবকাঠামোর ওপর একাধিক হামলা চালালেও তেহরানের অস্ত্রভাণ্ডার এখনও বড় ধরনের হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
বিবিসি বলছে, সর্বশেষ আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা খোররমশাহর-৪ ও কাদর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তেল আবিবে হামলা চালিয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরান ক্লাস্টার ধরনের গোলাবারুদও ব্যবহার করছে।