আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটি প্রথম বাজেট, একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুরও প্রথম বাজেট উপস্থাপন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণের চাপের মধ্যে সরকারকে এ বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তবে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রয়েছে ব্যাপক জন-প্রত্যাশা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা বাস্তবতায় বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের মতো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু আমরা হতাশ নই। এগিয়ে যাওয়ার পথ শুরু হয়েছে। অচিরেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব ইনশাআল্লাহ।”
অগ্রাধিকার পাচ্ছে যেসব খাত
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি, আর্থিক খাত সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী এই প্রথম বাজেটে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হবে বলেও জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা। বিশেষ করে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান এবং জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
কর্মসংস্থানে জোর দেওয়ার দাবি
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এমপি বলেন, “দেড় কোটি যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। তাই বাজেটে যুবকদের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসংস্থান পরিকল্পনা থাকতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, ভাষাগত দক্ষতার অভাবে অনেক বাংলাদেশি বিদেশে নিম্নমানের কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হন। এ কারণে বিদেশি ভাষা শিক্ষার প্রসার জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।
সীমিত সম্পদে বড় প্রত্যাশা
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সীমিত সম্পদের মধ্যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি রয়েছে; অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ সামাল দিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ভোক্তা সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের প্রতিফলন দেখতে চান তারা।
সংস্কার ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এবারের বাজেটে গুরুত্ব পেতে পারে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কৃষিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার চায় কৃষক দল
জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল এমপি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। তাই এই খাতকে অবহেলার সুযোগ নেই। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি বৃদ্ধি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং সারসহ কৃষি উপকরণ আরও সহজলভ্য করতে হবে।”
শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এটি ধাপে ধাপে ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই আসন্ন বাজেটে সেই লক্ষ্যের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই।”
তিনি গবেষণা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোরও দাবি জানান।
সরকারের বড় পরীক্ষা
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি হবে অর্থনীতির বর্তমান সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিপত্র।
তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা—এই তিনটি লক্ষ্য অর্জনই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সফলভাবে সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই বাজেটটি জনমুখী ও কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হবে।